১৬ বছর আগে গ্রামীণ ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ১০০ টাকা দিয়ে ১০০টি কেঁচো কিনে ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) তৈরির উদ্যোগ নেন আব্দুর রহিম। এখন প্রতিবছর ২৪০ মেট্রিক টন জৈব সার ও কেঁচো উৎপাদন করে ১৪ লাখ টাকার বেচাকেনা করেন তিনি। সব খরচ বাদে বছরে লাভ থাকে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা।
আব্দুর রহিম যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের বাসিন্দা। বাড়ির অদূরে মনোহরপুর কাছারিবাড়ি বাজার-সংলগ্ন ৪০ শতক জমি ইজারা নিয়ে তিনি ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরি করেন। স্ত্রী ও তিন ছেলে নিয়ে তাঁর সংসার। দুই ছেলে ইতিমধ্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ছোট ছেলে স্নাতকে পড়ছেন।
আব্দুর রহিম বলেন, স্নাতকোত্তর শেষ করার পর গ্রামীণ ব্যাংকে চাকরি শুরু করেন তিনি। ১৮ বছর চাকরি করার পর স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরির উদ্যোগ নেন। ২০১১ সালে ১০০ টাকা পুঁজিতে ১০০টি কেঁচো কিনে একটি নামদারের (চাড়ি) ভেতরে সার তৈরি শুরু করেন। ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিসর বাড়তে থাকে। এখন তাঁর প্রকল্পে পাঁচজন কর্মী নিয়মিত কাজ করেন। মাসে ২০ মেট্রিক টন সার উৎপাদন হয়। স্থানীয় কৃষক ছাড়াও যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলার কৃষক ও সার ব্যবসায়ীদের কাছে পাইকারি দরে সার বিক্রি করেন তিনি।
প্রথমে বিভিন্ন বাড়ি থেকে গোবর সংগ্রহ করে গ্যাসমুক্ত করতে খোলা আকাশের নিচে স্তূপ করে রাখা হয়। গোবর গ্যাসমুক্ত হতে এক মাস সময় লেগে যায়। পরে টিনশেডের নিচে ছায়াশীতল জায়গায় ৭ থেকে ৮ ইঞ্চি পুরু করে বেড তৈরি করা হয়। সেই বেডের ওপরে নির্দিষ্ট পরিমাণ কেঁচো ছেড়ে দেওয়া হয়। কেঁচো গোবর খেয়ে মল ত্যাগ করে। সেই মলই উৎকৃষ্ট মানের জৈব সার। পরে কেঁচো থেকে সার আলাদা করে বস্তায় ভরে বাজারজাত করা হয়।
আব্দুর রহিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এত দিন সনাতন পদ্ধতিতে সার তৈরি করে কৃষকদের কাছে বিক্রি করতাম। গত বছর থেকে ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করার উদ্যোগ নিই। পিকেএসএফের আর্থিক সহায়তায় নবলোক পরিষদ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা বিনা মূল্যে প্যাকেটজাত করার জন্য সেলাই মেশিনসহ অন্যান্য উপকরণ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে। যে কারণে এখন উদ্যোগটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এখন প্রতিবছর ২৪০ মেট্রিক টন সার উৎপাদন করে ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকার বেচাকেনা হচ্ছে।’

নবলোক পরিষদের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রসূন বিশ্বাস বলেন, ব্র্যান্ডিং সার্টিফিকেশন ও বাজারজাতকরণের বিষয়ে আব্দুর রহিমকে সহায়তা করেছে। প্রথমে সার্টিফিকেশনের জন্য ট্রেড লাইসেন্স ও জৈব সারের মান পরীক্ষার বিষয় ছিল। এরপর ওজন ও সেলাই মেশিনসহ বিভিন্ন উপকরণ দেওয়া হয়। আব্দুর রহিমের পাশাপাশি অন্যরা এগিয়ে এলে তাঁরা তাঁদের সহায়তা করবেন।
এদিকে রহিমের উদ্যোগ দেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কেঁচো সার তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, কেঁচোর মাধ্যমে তৈরি জৈব সারের প্রতিনিয়ত চাহিদা বাড়ছে। দাম ও মান নিয়ন্ত্রণে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে লাইসেন্সপ্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক মোশারফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রাসায়নিক সারের ব্যবহার মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় দিন দিন মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। মাটিতে জৈব সারের পরিমাণ ৫ শতাংশ থাকার কথা; কিন্তু সেখানে এখন আছে ১ শতাংশের নিচে। এ জন্য তাঁদের জৈব সারের উৎপাদন বাড়াতে হবে। আব্দুর রহিমের মতো উদ্যোক্তাদের কেঁচো সার তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে।








