একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু উৎসবের উপলক্ষ নয়, আত্মসমালোচনারও সময়। ১০৬ বছরে পদার্পণ করেছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সাহিত্য-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়ে আসা এই বিশ্ববিদ্যালয় আজও জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তবে এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের কিছু মৌলিক সংকটও রয়ে গেছে। আবাসনের তীব্র সংকট, হলের নিম্নমানের খাবার, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, গবেষণায় অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত চাপ এবং শিক্ষার্থীদের জীবনমান-সংক্রান্ত নানা সমস্যা এখনও আলোচনায় রয়েছে।
১৯২১ সালের ১ জুলাই মাত্র ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী, ১২টি বিভাগ ও তিনটি অনুষদ নিয়ে যাত্রা শুরু করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে ১৩টি অনুষদ, একাধিক ইনস্টিটিউট, ২০টির বেশি আবাসিক হল এবং প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে দেশের বৃহত্তম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে এসেছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, জাতীয় অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কূটনীতিক এবং অসংখ্য রাষ্ট্রনায়ক।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জাতি গঠনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। বিশ্বের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বাধীন দেশের জন্মদানে নেতৃত্ব দিয়েছে।”
তিনি আরো বলেন, “প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।” গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়কে বৈশ্বিক পর্যায়ে আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
উপাচার্য জানান, বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানে এগিয়ে নিতে গবেষণা, উদ্ভাবন ও একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে অ্যালামনাইদের সহযোগিতায় দুই হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। তার ভাষায়, “একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে চলতে পারে না। এটি আমাদের সবার প্রতিষ্ঠান। গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে।”
আবাসনের সংকট: শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি আবাসন সমস্যা। বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর তুলনায় আবাসিক আসনের সংখ্যা অনেক কম। ফলে হাজার হাজার শিক্ষার্থী হলে আসন না পেয়ে মেস, সাবলেট কিংবা দূরবর্তী এলাকা থেকে প্রতিদিন ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতে বাধ্য হন।
অনেক শিক্ষার্থী প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষে হলেও আসন পান না। কেউ কেউ রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় থাকেন। অন্যদিকে পুরোনো অনেক হল জরাজীর্ণ, কক্ষসংকট প্রকট এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতে, আবাসন সংকট শিক্ষার্থীদের একাডেমিক মনোযোগেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
হলের খাবার নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর ডাইনিং ব্যবস্থাও বহুদিন ধরেই সমালোচনার বিষয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, খাবারের মান প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। অনেক হলে খাবারে বৈচিত্র্য নেই, পুষ্টিমান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির কারণে খাবারের দাম বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে মানের উন্নতি হয়নি। নিম্নমানের চাল, অপর্যাপ্ত সবজি এবং মাছ-মাংসের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা হলের ডাইনিং ব্যবস্থার সংস্কার, আধুনিক রান্নাঘর এবং মান নিয়ন্ত্রণের দাবিতে আন্দোলনও করেছেন।
স্বাস্থ্যসেবা: কতটা প্রস্তুত বিশ্ববিদ্যালয়?
প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী এবং কয়েক হাজার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো এখনও প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমিত সুযোগ, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং ওষুধের স্বল্পতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন।
রাতের বেলায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া নিয়েও অনেক শিক্ষার্থী উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গুরুতর অসুস্থ হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাইরে সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রকে আধুনিক হাসপাতালসদৃশ প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার দাবিও বহু বছরের।
গবেষণায় এখনো পিছিয়ে
দেশের প্রধান গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত হলেও গবেষণায় বরাদ্দ, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গবেষণা অবকাঠামো এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগে গবেষণার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা বাড়লেও বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে গবেষণায় আরো বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে মত শিক্ষকদের।
শিক্ষার্থী রাজনীতি ও শিক্ষার পরিবেশ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিভিন্ন সময় সহিংসতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কও দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের মতে, একাডেমিক পরিবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
সম্ভাবনার জায়গাও বিস্তৃত
সব সংকটের মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনা ব্যাপক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, ন্যানোপ্রযুক্তি, জনস্বাস্থ্য, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং আন্তঃবিষয়ক গবেষণায় নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি এবং গবেষণা প্রকাশনাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
শিক্ষকদের মতে, গবেষণায় অধিক বিনিয়োগ, আধুনিক আবাসিক হল নির্মাণ, শিক্ষার্থীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, হলের খাদ্য ব্যবস্থার সংস্কার এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হতে পারে।
প্রশাসনের অবস্থান
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবাসন সংকট নিরসনে নতুন হল নির্মাণ, পুরোনো হলগুলোর সংস্কার এবং আবাসিক সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে হলের খাবারের মান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়ন এবং গবেষণা অবকাঠামো শক্তিশালী করার বিষয়েও কাজ চলছে। প্রশাসনের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণানির্ভর, শিক্ষার্থীবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই বর্তমান প্রশাসনের অন্যতম অগ্রাধিকার।
তবে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের দাবি, উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা জানানো হলেও আবাসন সংকট, হলের নিম্নমানের খাবার, মেডিকেল সেন্টারের সীমিত সেবা এবং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন ভোগান্তিতে এখনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। তাদের মতে, ১০৬ বছরে পদার্পণের এই মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়; বরং শিক্ষার্থীদের জীবনমান, কল্যাণ এবং গবেষণার পরিবেশে বাস্তব পরিবর্তন আনা।
১০৬ বছরে প্রত্যাশা
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা—শুধু ঐতিহ্যের স্মৃতিচারণ নয়, দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধানেও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হবে। কারণ, যে বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে, স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে এবং জাতিকে পথ দেখিয়েছে, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ—ঐতিহ্যের ধারক হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বমানের, গবেষণানির্ভর, শিক্ষার্থীবান্ধব এবং মানবিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হওয়া।








