বিশ্বকাপে শেষ হয়েও যেন শেষ হলো না এক রূপকথা! ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সঙ্গে অতিরিক্ত সময়ের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে ৩-২ ব্যবধানে হারলেও, আফ্রিকার ক্ষুদ্র দেশ কেপ ভার্দে বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায় নিলো মাথা উঁচু করেই। স্পেন, সৌদি আরব কিংবা উরুগুয়েকে রুখে দিয়ে আলবিসেলেস্তেদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করা এই দলটির খেলা স্তুতি কুড়িয়েছে গোটা বিশ্বের। সাড়ে পাঁচ লাখেরও কম জনসংখ্যার এই ছোট্ট দেশটি ফুটবল ইতিহাসে নিজেদের নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়। তাই তো এ বিদায় চোখের জলে নয়, কেপ ভার্দে বিদায় নিলো পুরো ফুটবল বিশ্বের নতমস্তক কুর্নিশে।
কাঁপলো আর্জেন্টিনা, কাঁদলো কেপ ভার্দে, তবে মাথা উঁচু করেই। এ অশ্রু বেদনার নয়, এ অশ্রু এক মহাকাব্যিক অর্জনের। রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, গ্যালারিতে তখন শুধুই করতালির গর্জন। যেন প্রকৃতিও হাততালি দিয়ে বলছে, শিরদাঁড়া উঁচু করো হে বীর, তোমরা আজ বিজয়ী!
ম্যাচ শেষে মেসি-মার্তিনেজদের চোখে-মুখে তখনও ঘোর বিস্ময়, যেন অলৌকিক কিছু একটার হাত থেকে বেঁচে ফেরার স্বস্তি। কাগজে-কলমে হয়তো ৩-২ গোলে লেখা থাকবে আর্জেন্টিনার জয়। তবে কেপ ভার্দে কি আসলেই হেরেছে? পুরো টুর্নামেন্টে তাদের অকুতোভয় সাহস, ইস্পাতকঠিন আত্মবিশ্বাস আর লড়াকু মানসিকতার গল্প ফুটবলপ্রেমীরা আজীবন স্মৃতির মণিকোঠায় জমিয়ে রাখবে।
অথচ মোটে পাঁচ লাখ ত্রিশ হাজার মানুষের এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র। জনসংখ্যার হিসেবে যা আমাদের ঢাকার যেকোনো একটা থানার চেয়েও কম। অথচ সেই অতি ক্ষুদ্র দেশটাই যখন বিশ্বমঞ্চে প্রথমবার পা রাখলো, ফুটবল বিধাতা যেন তাদের কপালে লিখে দিলেন এক বিরল কীর্তির ইতিহাস।
শুরুটা হয়েছিলো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে স্তব্ধ করে দিয়ে। এরপর এশিয়ার পরাশক্তি সৌদি আরবকে রুখে দেওয়া। গ্রুপ পর্বে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকেও হতাশায় ডুবিয়ে রূপকথার পালে হাওয়া লাগিয়েছিল আফ্রিকার এই দেশটি।
তবে সব রোমাঞ্চকে ছাড়িয়ে গেল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এই লড়াই। মেসিদের সাম্রাজ্যে হানা দিয়ে, প্রতি ইঞ্চিতে লড়াই করে ১২০ মিনিট বুক চিতিয়ে লড়ে যাওয়া। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে নিজেদের উজাড় করে দেওয়ার এই দৃশ্য যেন কোনো সাধারণ ম্যাচ ছিল না, ছিল এক মহাকাব্যিক ফাইনাল।
কেপ ভার্দে নামের অর্থের সঙ্গেই যেন মিশে আছে এই ফুটবলারদের লড়াকু ডিএনএ। সবুজের অন্তরীপ। বিংশ শতকের ভয়াবহ খরা আর প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এক জাতি তারা। জন্ম থেকেই যারা প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে, সেই আদিম লড়াইটাই যেন আজ ফুটে উঠেছিল সবুজ গালিচায়। বিনা যুদ্ধে নাহি দেবো সূচাগ্র মেদিনী! তাই তো বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে দুইবার পিছিয়ে পড়েও সিডনি কাবরালরা দেখালেন কীভাবে ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠতে হয়।
তবে ফুটবল ঈশ্বরের স্ক্রিপ্ট ছিল বড্ড নিষ্ঠুর। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার জয় আর কেপ ভার্দের হৃদয়ভঙ্গ হলো বোর্হেসের এক নির্মম আত্মঘাতী গোলে। তবে সব হার তো হার নয়। হেরেও যে কোটি মানুষের মন জেতা যায়, পরের প্রজন্মের জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রেখে যাওয়া যায়, তা প্রমাণ করলো কেপ ভার্দে।
ভবিষ্যতে হয়তো আবার কবে তারা বাছাইপর্বের বৈতরণী পার হয়ে বিশ্বমঞ্চে আসবে, তা কেউ জানে না। হয়তো সময়ের নিয়মে স্মৃতির ওপর ধুলো জমবে। তবে ফুটবল ইতিহাস যতদিন থাকবে, এই বীরত্বের গল্প অমর হয়ে থাকবে। গোটা ফুটবল বিশ্ব আজ একবাক্যে বলছে, স্যালুট কেপ ভার্দে। তোমরা হারোনি, তোমরা ইতিহাস হয়ে রইলে।








