সত্তর বছরের জীবনে মানুষ সাধারণত স্মৃতি জমায়- কিন্তু মমেনা বেগমের জীবনে জমেছে শুধু ভাঙনের ইতিহাস। ব্রহ্মপুত্রের বুকে চর জেগে ওঠা আর নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার নির্মমতার লড়াই করতেই কেটে গেছে তার সাত দশক। এই দীর্ঘ সময়ে অন্তত ২৫ বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন তিনি। একে একে হারিয়েছেন বসতভিটা, আবাদি জমি, গবাদিপশু- এমনকি ব্রহ্মপুত্রের উত্তাল স্রোত কেড়ে নিয়েছে তার এক সন্তানকেও। তবু প্রতিবারই নতুন করে ঘর বেঁধেছেন, আবারও বেঁচে থাকার লড়াই শুরু করেছেন।

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন কব‌লিত ‌চিলমারী ইউনিয়নের চর কড়াইবরিশাল এলাকার বিশারপাড়া আশ্রয়‌ণ প্রকল্পে মমেনা বেগমের সঙ্গে কথা হলে তিনি এসব তথ্য জানান।

জানা গেছে, একসময় গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু আর সচ্ছল সংসার ছিল মমেনা বেগম ও তার ৮০ বছর বয়সী স্বামী আব্দুল জব্বারের। কিন্তু নদীভাঙনের নির্মম থাবায় সেই স্বচ্ছলতা আজ কেবলই স্মৃতি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন একটু নিশ্চিন্তে থাকার কথা, তখনও তাদের পিছু ছাড়েনি ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন। এবারও নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হওয়ার পথে তাদের শেষ আশ্রয়টুকু। প্রতিদিন আতঙ্কে কাটছে দিন- কখন যে মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকুও নদীর বুকে হারিয়ে যায়, সেই শঙ্কাই এখন তাদের একমাত্র সঙ্গী।

মমেনা বেগমে বলেন, ‘চোখ যত দূর যাইতো, তত দূর পর্যন্ত আমগোর জমি আছিল। ব্রহ্মপুত্র সব খাইয়া ফেলছে। আগে হামার স্বামীর কাম করতে হইতো না। এখন নিঃস্ব হইয়া গেছি। কোনোমতে খায়া না খায়া দিন কাটাই। এর মধ্যে আবার নদী ভাঙা শুরু করছে। এখন চর ছাড়া যামো কই? 'এই চরোত হামার মরন।’

এই গল্প শুধু মমেনা-জব্বার দম্পতির নয়। গত চার দিনে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চর কড়াইবরিশাল, বিশারপাড়া ‌ আশয়ণ প্রকল্প ও শাখাহা‌তি গ্রামে ব্রহ্মপুত্রের ভয়াবহ ভাঙনে অন্তত ৭০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছেন। ভাঙ‌নের শিকার প‌রিবারগু‌লো এখন আশ্রয়হীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। ভাঙ‌নের ঝুঁকিতে রয়েছেন আরও দুই শতাধিক পরিবার।

যাদের ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, তারা কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ পাশের চরে, আবার কেউ উঁচু জায়গায় খুঁটি গেড়ে নতুন করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোথাও স্থায়ী আশ্রয়ের নিশ্চয়তা নেই।

বিশারপাড়া আশ্রয়ণের ভাঙনকবলিত নজরুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত ১৮বার নদীভাঙনের শিকার হইছি। ভাঙতে ভাঙতে নদী সব শেষ করে দিছে। ছয় মাসেই চারবার ভাঙ‌নের শিকার হয়েছি।

কড়াইব‌রিশাল এলাকার দিনমজুর ধলু মিয়ার স্ত্রী লাভলী বেগমের চোখে তখনও কান্না। তিনি বলেন, শনিবার থেকে হঠাৎ ভাঙন শুরু হয়েছে। ঘর সরানোর সময়ও পাওয়া যায়‌নি। রোববার বাড়িতে ভাঙন শুরু হয়েছে। থাকার জায়গা নেই, রান্না করার উপায় নেই। এখন এই ভাঙা ঘরবা‌ড়ি কোথায় নিয়ে যাবো তার কোনো ঠিকানা নেই।

২৫ বার ভিটে হারিয়ে সর্বস্বান্ত মমেনা, শেষ আশ্রয়ও এখন ভাঙনের মুখে

শাখাহা‌তি এলাকার ভাঙ‌নের শিকার ফারুক মিয়া বলেন, পাশের এক‌টি চরে এক বিঘা জ‌মি তিন লাখ টাকায় চু‌ক্তি করে‌ছি। যত‌দিন নদী ভাঙেনি তত‌দিন থাকতে পারব। নদী ভাঙ‌লে আর টাকা ফেরত দেবে না।

একইভাবে ভাঙনের শিকার সাইফুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম, ফাতেমা বেগমসহ কয়েকজন জানান, বছরের পর বছর নদী ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তারা আজ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। প্রতিবার নতুন করে ঘর তুললেও কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর আবারও নদী সবকিছু কেড়ে নেয়।

এদিকে ব্রহ্মপুত্র তাণ্ডব চালালেও পা‌নি উন্নয়নের কার্যকরী কোনো প‌দক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভাঙন কব‌লিত মানুষজন।

শুধু মানুষের ঘরবাড়িই নয়। ভাঙনের ঝঁ‌কিতে রয়েছে চর কড়াইবরিশাল নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, এক নম্বর চিলমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর শাখাহাতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঢুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কড়াইবরিশাল বাজার, চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, নির্মাণাধীন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, মসজিদ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

এ বিষয়ে চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙ‌নে এখন পর্যন্ত ৭০-৮০‌টি পরিবার নদী ভাঙ‌নের শিকার হয়ে তাদের ভিটেমা‌টি হা‌রিয়েছে। ভাঙ‌নের ঝুঁ‌কিতে রয়েছে ২০০-৩০০‌টি প‌রিবার। জেলা প্রশাসক, উপজেলা প্রশাসন ও পা‌নি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। ভাঙ‌নের শিকার এসব পরিবারের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা এবং যারা ভাঙ‌নের ঝুঁ‌কিতে আছে তারা যেন নদীতে ভেসে না যায় এ জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।

কু‌ড়িগ্রাম পা‌নি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রা‌কিবুল হাসান বলেন, চরের জন্য আমাদের কোনো বরাদ্দ নেই। তবুও সেখানে দেড় হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেখানে জিও ব্যাগ ডা‌ম্পিং করা হচ্ছে। তবে সেখানে কোনো জিও ডা‌ম্পিং করতে দেখা যায়‌নি।

তবে সরেজমিনে তার বক্তব্যের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়‌নি।

চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, এখানে প্রায় ৭০টি প‌রিবার ভাঙ‌নের শিকার হয়েছে। আমরা তাদেরকে শুকনো খাবার জিআর চাল সহায়তা করে‌ছি। ভাঙন কব‌লিত মানুষগুলো তাদের ঘর ভেঙে নিয়ে যেন অন্যত্র আশ্রয় নিতে পারে আমরা সে ব্যবস্থা করছি। এখানে দুইশোর বে‌শি প‌রিবার ভাঙ‌নের ঝুঁ‌কিতে রয়েছে, আমরা সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নি‌চ্ছি।

রোকনুজ্জামান মানু/এনএইচআর/এএসএম