ভোলার দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নে চার বছর ধরে বিদ্যুৎ নেই। মেঘনা নদীর তলদেশে স্থাপিত সাবমেরিন ক্যাবল ছিঁড়ে যাওয়ার পর থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও আজ পর্যন্ত তা মেরামত করা হয়নি। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কয়েক হাজার বাসিন্দা। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অচল হয়ে পড়েছে ফ্রিজ, টেলিভিশন, ফ্যানসহ নানা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয়রা জানায়, বেশ কয়েক যুগ আগে গঠিত ভোলার দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নে দীর্ঘদিন বিদ্যুতের কোনো সুবিধা ছিল না। পরে মেঘনা নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের মাধ্যমে ২০২১ সালের ৫ ডিসেম্বর মদনপুর ইউনিয়ন এবং ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন মাঝের চর এলাকায় প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে। বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়ে বদলে যেতে শুরু করে এসব এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা। তবে সেই স্বস্তি স্থায়ী হয় মাত্র সাত মাস। ২০২২ সালের ২৩ জুন মেঘনার তলদেশে স্থাপিত সাবমেরিন ক্যাবল ছিঁড়ে গেলে আবারও অন্ধকারে ডুবে যায় মদনপুর ইউনিয়ন ও কাচিয়া ইউনিয়নের মাঝের চর গ্রাম। ক্যাবল ছিঁড়ে যাওয়ার প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তা মেরামত করা হয়নি।

‘সাবমেরিক ক্যাবল ছিঁড়ে যাওয়ার পরে যারা সার্ভে করছেন আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন- মেঘনার তলদেশে সাবমেরিন ক্যাবলটি টিকছে না। ক্যাবল ছাড়া বিকল্প কোনো ব্যবস্থাও নেই। তবে এটি মেরামতের জন্য অনেক অর্থের প্রয়োজন। প্রকল্প ছাড়া সম্ভব না।’

ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে ৪ কিলোমিটার সাবমেরিন ক্যাবল লাইনের মাধ্যমে ভোলা সদরের তুলাতুলি থেকে বিদ্যুৎ দেওয়া হয় দৌলতখানের মদনপুর ইউনিয়ন ও সদরের কাচিয়া ইউনিয়নের মাঝের চর গ্রামে। সব মিলে বিদ্যুতের গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৮ শতাধিকের মতো।

৪ বছরেও জোড়া লাগেনি সাবমেরিন ক্যাবল, আজও অন্ধকারে মদনপুর ইউনিয়ন
বিদ্যুৎ না থাকায় অকেজো বৈদ্যুতিক পাখা/ ছবি: জাগো নিউজ

আরও পড়ুন

অস্তিত্ব সংকটে হোসনিগঞ্জের বেতশিল্প, পেশা ছাড়ছেন কারিগররা

মদনপুর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিদ্যুতের অভাবে শিশুসহ সব শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা বিঘ্ন হচ্ছে। চার বছর ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজ, টিভি, ফ্যানসহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। লোকসানের পড়েছেন গ্রাহকরা।

‘মদনপুর ইউনিয়নটি বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এখানকার মানুষের বেশিরভাগ মৎস্য পেশার সঙ্গে জড়িত। বেশিরভাগ মানুষ হতদরিদ্র হওয়ায় অনেকের বাড়িতে সোলার সিস্টেম নেই। যার কারণে গরমের বাড়িতে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা তেমন মনোযোগী হতে পারেন না। আমরা প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও স্কুলে সঠিকভাবে পাঠদান দিয়ে থাকি। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু থাকলে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনায় আরও বেশি মনোযোগী হতে পারতো।’

মদনপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় বাসিন্দা মো. আরিফ বলেন, ইউনিয়নে বিদ্যুৎ আসায় অনেক খুশি হয়েছিলাম। এরপর বিদ্যুতের মিটার সংযোগ দিই। ঘরে ফ্রিজ, লাইট, ফ্যানসহ বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনা হয়। সব মিলে প্রায় লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু ৬ মাস বিদ্যুৎ চলার পরে বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়। পরে জানলাম মেঘনার তলদেশের সাবমেরিন ক্যাবল ছিঁড়ে গেছে। ওই যে বিদ্যুৎ আমাদের কপাল থেকে গেছে আর আসলো না।

৪ বছরেও জোড়া লাগেনি সাবমেরিন ক্যাবল, আজও অন্ধকারে মদনপুর ইউনিয়ন

৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, মদনপুর ইউনিয়নের মানুষ কৃষি কাজ, মৎস্য শিকার ও গবাদি পশু পালন জীবিকা নির্বাহ করেন। আমাদের মদনপুরে যখন বিদ্যুৎ আসছিল তখন নদীতে তেমন মাছ ধরা পরতো না। জেলেদের হাতে টাকাও ছিল না। পরে আমরা অনেক জেলেরা এনজিও থেকে ঋণ, সুদের টাকা ও ধার-দেনা করে ঘরে বিদ্যুৎ নিয়েছিলাম। বিদ্যুৎ আসার আনন্দে ঘরে কত কিছু যে কিনছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের বিদ্যুৎ বেশি দিন আর থাকলো না। মাঝখানে বিদ্যুৎ আসার আনন্দে দেনা করে যে বৈদ্যুতিক সামগ্রী কিনছি সে দেনা অনেক কষ্টে পরিশোধ করতে হয়েছে। বিদ্যুৎ মদনপুরে এসে আমাদের দেনা করে চলে গেছে।

আরও পড়ুন

সাদা মাছির আক্রমণে কমছে নারিকেল উৎপাদন, ধুঁকছে তেল শিল্প

বাসিন্দা মালেকা বেগম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় আমরা প্রচণ্ড গড়মে কষ্ট করছি। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না। হাত পাখা নিয়ে সারাদিন বাতাস করতে হয়। বাচ্চাদের নিয়ে অনেক বিপদে পরতে হয়। বাচ্চারা গরমে সারাদিন কান্না করে। বিদ্যুৎ আসার পর ফ্যান ও লাইট কিনেছিলাম সেগুলো সব নষ্ট হয়ে গেছে।

‘বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিদ্যুতের অভাবে শিশুসহ সব শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা বিঘ্ন হচ্ছে। চার বছর ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজ, টিভি, ফ্যানসহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। লোকসানের পড়েছেন গ্রাহকরা।’

ওই ওয়ার্ডের বাসিন্দা নূর জাহান বেগম বলেন, বিদ্যুতের জন্য ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা হয় না। সন্ধ্যার পরই তারা ঘুমিয়ে যায়। বিদ্যুৎ থাকলে লাইটের আলোতে ফ্যানের বাতাসে তারা রাত ১০/১১টা পর্যন্ত পড়াশুনা করতে পারতো। কিন্তু এখন বিদ্যুতের কারণে আমাদের ছেলে-মেয়েরা ঠিক মতো পড়াশুনা করতে পারছে না।

৪ বছরেও জোড়া লাগেনি সাবমেরিন ক্যাবল, আজও অন্ধকারে মদনপুর ইউনিয়ন

ব্যবসায়ী মো. জামাল উদ্দিন সকেট ও আব্দুল মালেক জানান, মদনপুরে প্রায় ১৫/২০ হাজার মানুষের বসবাস। বিদ্যুৎ আসার পরে মদনপুরে ব্যবসা ও বাণিজ্য অনেক উন্নতি হয়েছিল। দীর্ঘ চার বছর ধরে আমাদের মদনপুরে বিদ্যুৎ নেই। এতে যেমন ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ, ছাত্র-ছাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি জেলে, কৃষক, গবাদি পশু পালনকারীও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা বারবার বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে সমস্যা সমাধানের দাবি করলেও কোনো সমাধান হয়নি। তাই আমরা মদনপুরবাসী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন করছি মদনপুরের বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য।

আরও পড়ুন

৬ বার নদীগর্ভে বিদ্যালয়, তবু নেভেনি শিক্ষার আলো

মদনপুর ইউনিয়নের ১০২ নম্বর চর পদ্মা মকবুল আহমেদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শিহাব উদ্দিন বলেন, এই বিদ্যালয়ে মোট ১৩৫ জন শিক্ষার্থী আছে। প্রতিদিন ১১০ থেকে ১১৫ জন উপস্থিত থাকেন। আবার অনেক সময় ১২০/১৩০ জনও উপস্থিত হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ক্লাস রুমে ঘেমে যায়। এতে শিক্ষার্থীরা পাঠদানে বেশি মনযোগী হতে পারে না। গরম বেশি থাকলে বিরতির সময় অনেক শিক্ষার্থীরা আমাদের না জানিয়ে বাড়ি চলে যায়।

তিনি আরও বলেন, মদনপুর ইউনিয়নটি বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এখানকার মানুষের বেশিরভাগ মৎস্য পেশার সঙ্গে জড়িত। বেশিরভাগ মানুষ হতদরিদ্র হওয়ায় অনেকের বাড়িতে সোলার সিস্টেম নেই। যার কারণে গরমের বাড়িতে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা তেমন মনোযোগী হতে পারেন না। আমরা প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও স্কুলে সঠিকভাবে পাঠদান দিয়ে থাকি। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু থাকলে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনায় আরও বেশি মনোযোগী হতে পারতো।

ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার শাহ্ মো. রাজ্জাকুর রহমান জানান, সাবমেরিক ক্যাবল ছিঁড়ে যাওয়ার পরে যারা সার্ভে করছেন আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন- মেঘনার তলদেশে সাবমেরিন ক্যাবলটি টিকছে না। ক্যাবল ছাড়া বিকল্প কোনো ব্যবস্থাও নেই। তবে এটি মেরামতের জন্য অনেক অর্থের প্রয়োজন। প্রকল্প ছাড়া সম্ভব না।

ভোলা জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান জানান, ভোলায় যোগদানের পরে বিষয়টি শুনেছি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অবগত করা হবে।

এনএইচআর/জেআইএম