হামে মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম উপসর্গ নিয়ে (সন্দেহভাজন হাম) আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এ সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৪ মাসে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হামে ৭৯৭ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ৯৫ শিশু এবং উপসর্গ নিয়ে ৭০২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২৬ জুন সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হামে শিশুমৃত্যু ৭০০ ছাড়ায়। অর্থাৎ ২৬ দিনের মাথায় এসে মৃত্যু ৮০০ ছুঁইছুঁই হলো। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হাম পরিস্থিতি বিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
অধিদপ্তর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে অর্থাৎ সন্দেহভাজন হামে মারা যাওয়া চার শিশুর মধ্যে সিলেট বিভাগে দুই, রাজশাহী বিভাগে এক এবং ময়মনসিংহ বিভাগে একটি শিশু রয়েছে। এ সময় ল্যাবে নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে ১৩০ শিশুর শরীরে হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। এছাড়া আরও ৮৭৮ জনের মধ্যে হাম উপসর্গ পাওয়া গেছে। ফলে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ১০০৮-এ দাঁড়িয়েছে। আর ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৮। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৭০৮ শিশুর শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ পর্যন্ত সারা দেশে মোট ১ লাখ ২ হাজার ২৪৪ শিশু হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯৮ হাজার ৪১১টি শিশু।
হাম প্রাদুর্ভাব ও সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষজ্ঞরা ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার সুপারিশ করেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও ইউনিসেফ বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেয়। চলতি বছরের ৫ এপ্রিল ঢাকার বাইরে বিশেষ গণটিকা কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ১২ এপ্রিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী জাতীয়ভাবে গণটিকা কার্যক্রম পরিচালনা করে সরকার। ২০ মে এই ক্যাম্পেইন শেষ হয়। দুই মাস আগে শেষ হওয়া ক্যাম্পেইন বিষয়ে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি ১০৩ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে। বর্তমানে হামের নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। গতকাল (মঙ্গলবার) পর্যন্ত দেশের ১০৭ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় এসেছে।
রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম নিয়ে ভর্তি রোগীদের ওপর সম্প্রতি করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি। অন্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৫২ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা ৩৪১ শিশুকে নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে। এসব শিশুর বয়স ছিল ১৪ বছরের মধ্যে। গবেষণাটি করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর.বি) ও শিশু হাসপাতালের ১৯ জন গবেষকের একটি দল।
গবেষণায় দেখা গেছে-৮০ শতাংশ শিশু হামের টিকাই পায়নি। তাদের মধ্যে ৪৩ শতাংশের টিকা পাওয়ার বয়সই হয়নি, এদের বয়স ছিল ৬ মাসের কম। ৯ মাসের বেশি বয়স হলেও ৩৭ শতাংশ শিশু কোনো টিকা পায়নি। বাকিদের ১৪ শতাংশ হামের টিকার এক ডোজ পেয়েছে। অবশিষ্ট ৬ শতাংশ দুই ডোজ পেয়েছে। এ বিষয়ে আইসিডিডিআর.বির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ও ভাইরোলজি ল্যাবরেটরি অ্যান্ড জেনম সেন্টারের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান বলেন-হাম, টিকার কার্যকারিতা, শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া দরকার। এছাড়া গর্ভবতী মায়েদের হামের টিকার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।







