বর্ষাকাল মানেই চারদিকে প্যাচপেচে কাদা আর অসময়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। তবে আমাদের পাড়ার মতিম ভাইয়ের কাছে বৃষ্টি মানেই এক বিশেষ ‘গণিত’। মতিম ভাই নিজেকে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ মনে করেন। আকাশ দেখে তিনি অনায়াসেই বলে দিতে পারেন, কখন বৃষ্টি হবে, কতক্ষণ স্থায়ী হবে এবং বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ঠিক কত ডিগ্রি কোণে মাটির দিকে ধাবিত হবে! যদিও তার কোনো ভবিষ্যদ্বাণীই আজ পর্যন্ত মেলেনি, তবুও মতিম ভাইয়ের আত্মবিশ্বাস হিমালয়ের চূড়া সমান।
সেদিন ছিল ছুটির দিন। পাড়ার বড় মাঠে এলাকার ছেলেরা মিলে খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেছে। আকাশটা সকাল থেকেই একটু গোমড়া হয়ে ছিল। সবাই যখন দ্বিধায় ছিল যে আদৌ রান্নাটা শুরু করা ঠিক হবে কি না, তখনই আসরে হাজির মতিম ভাই। এক হাতে ভাঙা একটা ছাতা আর অন্য হাতে একটা আতশ কাচ নিয়ে তিনি আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে রইলেন। এরপর গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘ছেলেরা, নির্ভয়ে কাজ শুরু কর। বাতাস যেদিকে বইছে, তাতে কালো মেঘগুলো সব উত্তর দিকে চলে যাচ্ছে। আগামী চব্বিশ ঘণ্টায় এ এলাকায় এক ফোঁটা জল পড়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি!’
মতিম ভাইয়ের কথায় সবাই নিশ্চিন্ত মনে বিশাল ডেকচিতে খিচুড়ি বসিয়ে দিল। মাংস কষানোর গন্ধে যখন চারপাশ ম ম করছে, ঠিক তখনই ঘটল বিপত্তি। কোনো জানান না দিয়েই আকাশ চিরে এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকাল এবং শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। সবার আনন্দ মুহূর্তেই আতঙ্কে পরিণত হলো। যে যেদিকে পারল ডেকচি আর রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে দৌড় দিল।
পনেরো মিনিট পর দেখা গেল মতিম ভাই তার সেই ভাঙা ছাতাটা নিয়ে মাঠের মাঝখানে এক হাঁটু জলের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ছাতাটা এমনভাবে ধরেছেন যে, ছাতার ফুটো দিয়ে জল সোজা তার মাথায় পড়ছে। তার পুরো শরীর ভিজে একাকার। পাড়ার রতন চিৎকার করে বলল, ‘কী মতিম ভাই, আপনার বাতাস কোনদিকে গেল? বলেছিলেন না চব্বিশ ঘণ্টায় বৃষ্টি হবে না?’
মতিম ভাই বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে জলেভেজা চশমাটা নাক থেকে একটু ওপরে তুলে বললেন, ‘আরে রতন, তুই বুঝবি না। এটা আসলে বৃষ্টি না।’
‘মানে? আকাশ থেকে কি তবে শরবত পড়ছে?’
মতিম ভাই বিজ্ঞের মতো বললেন, ‘বিজ্ঞান দিয়ে বোঝ। এটাকে বলে লোকাল কনডেন্সেশন। মেঘগুলো উত্তর দিকেই যাচ্ছিল, কিন্তু মাঠের খিচুড়ির মাংসের গন্ধ পেয়ে ওরা লোভ সামলাতে পারেনি। সেন্ট্রিপেটাল ফোর্সের কারণে মেঘগুলো হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে আমাদের মাথার ওপর ফেটে পড়েছে। এটা প্রকৃতির বিচ্যুতি, আমার গণিতের ভুল নয়!’
সবাই যখন মতিম ভাইয়ের এমন অদ্ভুত যুক্তি শুনে হো হো করে হাসছে, তখন বাড়ি থেকে ভাবি (মতিম ভাইয়ের স্ত্রী) চিৎকার করতে করতে মাঠে এলেন। তার হাতে একটা ঝাড়ু। তিনি চেঁচিয়ে বললেন, ‘ওগো গণিতবিদ, ঘরে জানালা খোলা রেখে বৃষ্টির হিসাব করতে গিয়েছিলে? এদিকে সোফা থেকে শুরু করে বিছানা-সব তো ভেসে যাচ্ছে! আজ আর তোমার বাড়িতে ঢোকা হবে না, এ মাঠেই শুয়ে থাক!’
মতিম ভাই এবার আর কোনো বিজ্ঞান দেখানোর সুযোগ পেলেন না। সেই ভাঙা ছাতাটা মাথার ওপর ধরে কাঁচুমাচু মুখে ভাবির পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলেন। যাওয়ার সময় আমাদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে গেলেন, ‘আসলে মেঘের কনডেন্সেশন না রে ভাই, গিন্নি রেগে গেলে আবহাওয়া এমনিতেই দুর্যোগপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটা পৃথিবীর কোনো ব্যারোমিটারে মাপা সম্ভব নয়!’
সেদিন বৃষ্টি থেমেছিল ঠিকই, কিন্তু মতিম ভাইয়ের ওপর ভাবির সেই রাগের বৃষ্টি কতক্ষণ চলেছিল, তা আজও রহস্য হয়ে রয়ে গেছে।








