বিশ্বকাপের মঞ্চে নকআউটের মহারণ মানেই স্নায়ুর চরম পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষা যদি দিতে হয় মেক্সিকো সিটির সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচুতে অবস্থিত আজতেকা স্টেডিয়ামের গগনবিদারী গ্যালারির সামনে, তবে যেকোনো পরাশক্তির বুকেও কাঁপন ধরতে বাধ্য। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মহাযুদ্ধে এবার সেই অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড।তবে এই ম্যাচের আবহ শুধু মাঠের ফুটবল ছাড়িয়ে রূপ নিয়েছে এক মনস্তাত্ত্বিক মনস্তত্ত্বে, যেখানে একপাশে রয়েছে ঘরের মাঠে মেক্সিকোর ‘ভয়ংকর’ অপরাজেয় রেকর্ড, আর অন্যপাশে ইংলিশ শিবিরের ওপর ভর করা দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘ভূত’।আজতেকার সেই দুর্ভেদ্য দুর্গ: শুধুই কি পরিসংখ্যান, নাকি অন্য কিছু?১৯৬৬ সালে উদ্বোধনের পর থেকে আজতেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকোর পরিসংখ্যান যেকোনো ফুটবলপ্রেমীর চোখ কপালে তোলার জন্য যথেষ্ট। এই মাঠে খেলা ৮৯টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের মধ্যে ৭০টিতেই জিতেছে মেক্সিকো, ড্র ১৭টি আর পরাজয় মাত্র ২টি! এমনকি বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের চেনা আঙিনায় তারা কখনোই হারেনি। এবারের আসরের যৌথ আয়োজক মেক্সিকো এই মাঠে ১১টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে ৯টিতেই জয় পেয়েছে। কাগজে-কলমে এই রেকর্ড ইংলিশ সমর্থকদের মনে ভয় ধরাতেই পারে, বিশেষ করে যখন ঘরের মাঠ ওয়েম্বলিতে থ্রি-লায়ন্সদের সাম্প্রতিক রেকর্ড একেবারেই নড়বড়ে।তবে ফুটবল পণ্ডিতরা বলছেন, এই দানবীয় রেকর্ডের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য এক সত্য। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আজতেকায় মেক্সিকোর বেশিরভাগ জয়ই এসেছে জ্যামাইকা, হন্ডুরাস বা পানামার মতো কনকাকাফ অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলগুলোর বিপক্ষে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তাদের পরীক্ষা আসলে সেভাবে হয়নি বললেই চলে। ২০০৩ সালের পর এবার ইংল্যান্ডই হতে যাচ্ছে আজতেকায় মেক্সিকোর মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে বড় পরাশক্তি।টুখেলের হুঙ্কার: ম্যারাডোনার ভূত তাড়ানোর মোক্ষম সুযোগআজতেকা স্টেডিয়ামের নাম শুনলেই ইংলিশ ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে এক তীব্র কষ্টের স্মৃতি ভেসে ওঠে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই কোয়ার্টার ফাইনাল, যেখানে এই মাঠেই দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই কুখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং শতাব্দীর সেরা গোলের শিকার হয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছিল ইংল্যান্ড। ৪০ বছর পর আবারও সেই একই মাঠে, একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইংলিশ কোচ থমাস টুখেল যেন অতীতকে উপড়ে ফেলার মন্ত্র খুঁজছেন।ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রতিপক্ষের রেকর্ডকে সমীহ করেও রসিকতার ছলে টুখেল হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, "ম্যারাডোনার সেই ম্যাচের ভূত তাড়ানোর এবং প্রতিশোধ নেওয়ার এটাই আমাদের সেরা সুযোগ।" ইংলিশ কোচের এই আত্মবিশ্বাসী বাণীই প্রমাণ করে, তার শিষ্যরা মাঠের রণকৌশলের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের হোমওয়ার্কও সেরে রেখেছেন।ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষাবিশ্বকাপের ইতিহাসে আজতেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকোকে প্রথম দল হিসেবে হারাতে হলে হ্যারি কেইন, বুকায়ো সাকাদের একবিংশ শতাব্দীর সেরা ফুটবলটাই খেলতে হবে। পরিসংখ্যান কিংবা ইতিহাস হয়তো মেক্সিকোর পক্ষে কথা বলছে, তবে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় তো সব ‘প্রথম’-এরই একটা নতুন শুরু থাকে।আজতেকার গগনবিদারী গ্যালারির গর্জন থামিয়ে থমাস টুখেলের শিষ্যরা কি পারবেন ৪৬ লাখ মানুষের কান্না আর ম্যারাডোনার সেই অভিশপ্ত অতীতকে পেছনে ফেলে নতুন ইতিহাস লিখতে? নাকি আজতেকার দুর্গেই অবসান ঘটবে ইংলিশদের বিশ্বকাপ স্বপ্নের?
রাজনীতি
আজতেকার রূপকথা বনাম ম্যারাডোনার ‘ভূত’

শেয়ার করুন







