ইউরোপ যখন কেবল কেবল সংবাদপত্র উদ্ভাবনের পথে এগোচ্ছিল, তার অনেক আগেই মুঘল ভারত গড়ে তুলেছিল নিজস্ব সংবাদ-নেটওয়ার্ক। ষোড়শ শতকের শেষভাগ থেকে লেখক, সংবাদ সংগ্রাহক, দাপ্তরিক কর্মী ও গোপন সংবাদবাহকদের বিশাল এক বাহিনী সংকলন করত ‘আখবারাত’ নামে পরিচিত সংক্ষিপ্ত সংবাদ প্রতিবেদন। এসব প্রতিবেদনে থাকত বিভিন্ন রাজ দরবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব, সামরিক অভিযান, পদায়ন, আর্থিক বিষয় এবং নানা গুঞ্জন ও গসিপ।
ভঙ্গুর কাগজে দ্রুত হাতের লেখায় ফারসি ভাষায় লেখা এসব দলিল ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের তথ্যপ্রবাহের কেন্দ্র। এক অর্থে এগুলো ছিল গোয়েন্দা প্রতিবেদন, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং সংবাদ বুলেটিনের মিশ্র রূপ। প্রতিদিন শত শত, এমনকি হয়তো হাজার হাজার আখবারাত সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় দরবার ও প্রাদেশিক প্রশাসনের মধ্যে আদান-প্রদান হতো।
এভাবেই সংযুক্ত থাকত সেই ঐতিহাসিক সাম্রাজ্য, যা একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জনগোষ্ঠীর ওপর শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। এসব প্রতিবেদনের অনেকগুলো সমবেত কর্মকর্তাদের সামনে উচ্চস্বরে পড়ে শোনানো হতো, যাতে সম্রাটের দরবারের খবর পৌঁছে যায় সাম্রাজ্যের দূরতম প্রান্ত পর্যন্ত।
দশকের পর দশক ধরে এসব প্রতিবেদন, আদেশপত্র ও প্রশাসনিক নথির হাজার হাজার পৃষ্ঠা ভারতের ও ব্রিটেনের নানা গ্রন্থাগার ও আর্কাইভে পড়ে ছিল। ইতিহাসবিদেরা জানতেন এগুলোর অস্তিত্ব আছে। কিন্তু খুব কম মানুষই সেগুলোর গভীরে প্রবেশ করেছিলেন।
এই কাজটিই প্রায় দুই দশক ধরে করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির ইতিহাসবিদ মুনিস ডি ফারুকি। ২০০৭ সালে তিনি ডুবে যান ‘আখবারাত-ই দরবার-ই মুয়াল্লা’ (উচ্চ দরবারের সংবাদপত্র) নামের বিশাল সংগ্রহে, যা ভারত ও ব্রিটেনের বিভিন্ন আর্কাইভে সংরক্ষিত।
কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ৬ হাজার ৫০০ পৃষ্ঠারও বেশি দলিল ঘেঁটে তিনি অনুসরণ করেন রাজপুত্র, সেনাপতি, দরবারি, রাজপরিবারের নারী সদস্য, রাজকীয় খোজা এবং আরও বহু মানুষের জীবন ও কর্মকাণ্ডের চিহ্ন, যা ছড়িয়ে আছে কয়েক দশকজুড়ে লেখা হাজার হাজার নথিভুক্ত প্রতিবেদনে। ই গবেষণার ফল একটি প্রকাশিতব্য ইতিহাসগ্রন্থ। এই গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব (তাঁর সাম্রাজ্যিক উপাধি আলমগীর) এবং সপ্তদশ শতকের শেষভাগের মুঘল সাম্রাজ্য।
বইটি শুধু ভারতের সবচেয়ে আলোচিত মুঘল শাসকদের একজনকে নতুনভাবেই তুলে ধরে না, বরং দেখায় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাক-আধুনিক সাম্রাজ্য বাস্তবে কীভাবে পরিচালিত হতো। মুঘল যুগের এসব সংবাদপত্র অন্তত চারটি পরিচিত সংগ্রহে টিকে আছে। সেগুলো রয়েছে—লন্ডন, বিকানের, সীতামাউ ও কলকাতায়। তবে ইতিহাসবিদদের ধারণা, ব্যক্তিগত সংগ্রহেও আরও নথি থাকতে পারে।
একটি বড় সংগ্রহ সংরক্ষিত ছিল জয়পুর দুর্গের শীতল ও শুষ্ক ভূগর্ভস্থ কক্ষে, গুচ্ছ আকারে। ঊনবিংশ শতকের শুরুর দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ও প্রাচ্যবিদ জেমস টড এসব প্রতিবেদনের একটি বড় অংশ ধার নেন। ১৮২৩ সালে ব্রিটেনে ফিরে যাওয়ার সময় তিনি আর সেগুলো ফেরত দেননি। পরে তিনি সেগুলো রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রন্থাগারে দান করেন। সবচেয়ে সমৃদ্ধ সংগ্রহটি রয়েছে কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে। সেখানে আওরঙ্গজেবের শাসনামল নিয়ে সংরক্ষিত আছে ২১ খণ্ডের বিশাল সংকলন।
আওরঙ্গজেব ১৬৫৮ থেকে ১৭০৭ সাল পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্য শাসন করেন এবং তিনিই ছিলেন সাম্রাজ্যের শেষ মহান সম্প্রসারণবাদী সম্রাট। এই খণ্ডগুলো একসময় ছিল ভারতীয় ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎ ইতিহাসবিদ স্যার যদুনাথ সরকারের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের অংশ। আওরঙ্গজেবের সবচেয়ে প্রভাবশালী জীবনীকার হিসেবেও তিনি পরিচিত।
প্রথম নজরে এসব উপকরণের বড় অংশই নিছক নীরস মনে হতে পারে। কোথাও পদায়ন, কোথাও বিরোধ, সামরিক চলাচল, উপহার, অসুস্থতা কিংবা অবিরাম প্রশাসনিক খুঁটিনাটি। কিন্তু সবগুলো একত্রে পড়লে এগুলো হয়ে ওঠে এক বিরল দলিল। যেন একটি সাম্রাজ্য নিজেকেই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে—মনে করেন ফারুকি।
আওরঙ্গজেবের সিংহাসনে বসার প্রথম দুই দশকের নথিপত্র অসম্পূর্ণ ও বিচ্ছিন্ন। কিন্তু ১৬৮০-এর দশকের শুরু থেকে সংরক্ষিত উপাদানের পরিমাণ বিস্ময়কর। বছরের পর বছর প্রায় প্রতিদিনের প্রতিবেদন সেখানে পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে এগুলো আলোকপাত করে সম্রাটের প্রায় অর্ধশতাব্দী দীর্ঘ শাসনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময়ের ওপর।
ফারুকি তাঁর একাডেমিক জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন সপ্তদশ শতকের শেষভাগের মুঘল বিশ্ব নিয়ে চিন্তা করে। সেই সময় সাম্রাজ্য ছিল শক্তির শীর্ষে। কিন্তু একই সঙ্গে ধীরে ধীরে এমন এক অবক্ষয়ের দিকেও এগোচ্ছিল, যা পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনের পথ খুলে দেয়।
আখবারাত ফারুকিকে সেই বিশ্ব দেখার নতুন একটি জানালা দিয়েছে। ফারুকি বলেন, ‘আখবারাত নিয়ে কাজ করার পুরো অভিজ্ঞতাই আমার কাছে একের পর এক বড় আবিষ্কারের মুহূর্ত। তখনকার তথ্য-পরিবেশ কতটা ঘন, কতটা বিস্তৃত ছিল, তা আমাকে এখনও বিস্মিত করে।’
ফারুকি যে সংবাদ প্রতিবেদনগুলো নিয়ে কাজ করেছেন, সেগুলো লেখা হয়েছিল জয়পুরের রাজার জন্য। সম্ভবত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলজুড়ে আরও শত শত অভিজাত, রাজপুত্র ও কর্মকর্তা নিজেদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে একই ধরনের প্রতিবেদন পেতেন। এভাবেই গড়ে উঠেছিল প্রাক-আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত তথ্য-নেটওয়ার্কগুলোর একটি। ফারুকির ভাষায়, ‘যে জ্ঞানসংগ্রহ ও জ্ঞান-স্থানান্তরের ব্যবস্থা এমন সমৃদ্ধ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করেছিল, সেটি নিয়ে ভাবলেই আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই।’
তথ্যের বিশাল ভাণ্ডার ইঙ্গিত করে যে, প্রাক-আধুনিক মানদণ্ডে বিচার করলে মুঘল রাষ্ট্র তার বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য সম্পর্কে বিস্ময়করভাবে পরিশীলিত ও গভীর ধারণা রাখত। ফারুকি মনে করেন, সেই তথ্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারত, তা পরিস্থিতিভেদে বদলাত। কিন্তু তাদের প্রশাসনিক পৌঁছ ছিল এমন যে তা কোটি কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছিল, কখনও ইতিবাচকভাবে, কখনও নেতিবাচকভাবে।
বারবার এসব প্রতিবেদন ফারুকির দীর্ঘদিনের ধারণাকে বদলে দিয়েছে। তিনি বলেন, আওরঙ্গজেবের দরবারকে ঘিরে যে ব্যাপক ধর্মান্তরের ধারণা প্রচলিত, তার পক্ষে খুব সামান্যই প্রমাণ তিনি পেয়েছেন। অন্যদিকে, সম্রাটের হারেম ও খোজা প্রশাসন (ইউনুখেট) যে রাজনৈতিকভাবে কতটা প্রভাবশালী ছিল, তা তাঁর কল্পনারও বাইরে।
তাঁর প্রত্যাশার তুলনায় সম্রাটকে অনেক কম দূরবর্তী ও কঠোর মনে হয়েছে। একই সঙ্গে, এসব প্রতিবেদনে শিখদের মতো গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক উল্লেখও তিনি অনেক কম পেয়েছেন। এটি শিখদের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সঙ্গে বৈপরীত্য তৈরি করে, যেখানে অন্তত ১৭১১ সাল থেকেই আওরঙ্গজেবকে তাঁদের আধ্যাত্মিক নেতা ও সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের জন্য দায়ী করা হয়ে আসছে।
কিছু আবিষ্কার অবশ্য নাটকীয় কোনো তথ্য উন্মোচন থেকে আসেনি, বরং একই বিষয় বারবার ফিরে আসার মাধ্যমে সামনে এসেছে। ফারুকি দেখেছেন, সংবাদপত্রসদৃশ ওই নথিগুলোতে একটি নাম বারবার উঠে আসছে—জিনাত-উন-নিসা, আওরঙ্গজেবের কন্যা। ইতিহাসবিদেরা তাঁর সম্পর্কে জানতেন, কিন্তু দরবারে তাঁর ভূমিকা নিয়ে খুব কমই লেখা হয়েছিল। অথচ পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় তিনি উপস্থিত ছিলেন।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফারুকি বুঝতে পারেন, তিনি কোনো গৌণ রাজপরিবারের সদস্য নন। জিনাত-উন-নিসা ছিলেন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক চরিত্র এবং জীবনের শেষভাগে বয়সে প্রবীণ ও রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠা তাঁর পিতার জন্য এক ‘অসাধারণ প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র।’ ফারুকি এরপর থেকে তাঁর নামের প্রতিটি উল্লেখ নথিভুক্ত করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে মুঘল হারেম নিয়ে তাঁর বিবরণে জিনাত-উন-নিসা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেন।
প্রতিটি নতুন আবিষ্কার তাঁকে পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করেছে। ফারুকি বলেন, ‘১৯৯০–এর দশক থেকে [যখন আমি প্রথম আখবারাত সম্পর্কে শুনি] আমি নিজের কাছে যে গল্পগুলো বলে এসেছি, সেগুলোর অনেকগুলোই নতুন করে ভাবতে হয়েছে।’ তাঁর মতে, আখবারাত শুধু আওরঙ্গজেবকে নয়, পুরো মুঘল সাম্রাজ্যকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে।
ফারুকি বলেন, তিনি এই দ্বিধা বুঝতে পারেন। কর্মজীবনের শুরুর দিকে তিনি মুঘল যুগের আরেকটি বিশাল আর্কাইভ নিয়ে টানা সাত সপ্তাহ কাজ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রায় এক দশক ধরে বিশাল, সূচিবিহীন আর্কাইভ নিয়ে কাজ করার বিষয়ে সতর্ক করে রেখেছিল।
আখবারাতও ছিল একই ধরনের চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘এখানে কিছু খুঁজে বের করা মানে যেন খড়ের গাদায় সুই খোঁজা।’ কোনো সূচি নেই, কিন্তু আছে হাজার হাজার নথিভুক্ত তথ্য। ফলে এই আর্কাইভে কাজ করতে দরকার ধৈর্য, মানসিক সহনশীলতা এবং প্যাটার্ন ও প্রাসঙ্গিক তথ্য খুঁজে বের করার জন্য পৃষ্ঠা পর পৃষ্ঠা পড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি। ফারুকির মতে, আওরঙ্গজেবকে ঘিরে নতুন বিতর্ক বারবার জন্ম নেওয়ার একটি বড় কারণ হলো তথ্যভাণ্ডারের বিপুলতা।
প্রথম দিকের মুঘল সম্রাটদের ক্ষেত্রে প্রমাণভিত্তিক দলিল তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও, আওরঙ্গজেবের আমলে দলিলের বিস্তার যেন বিস্ফোরণের মতো বেড়ে যায়। প্রশাসনিক আর্কাইভ, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, আঞ্চলিক ইতিহাস, জীবনীভিত্তিক অভিধান, কবিতা, ইউরোপীয় বাণিজ্য কোম্পানির নথি এবং ভ্রমণকারীদের বিবরণ, সবই প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।
ফারুকির কাছে আখবারাত ছিল অপরিহার্য। কিন্তু এটি বৃহত্তর এক বিশাল আর্কাইভের মাত্র একটি অংশ, যা এখনো বিস্ময়করভাবে কম ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাইরে পড়ে থাকা এই বিপুল উপকরণের ভিত্তিতে ডজন ডজন, এমনকি তারও বেশি বই লেখা সম্ভব। শুধু দরকার সাহসী ইতিহাসবিদদের, যারা এগুলো কাজে লাগাতে এগিয়ে আসবেন।’
ফারুকি যখন প্রথম কলকাতায় এই সংগ্রহ খুলে দেখেন, তখন তাঁর ধারণাই ছিল না কী অপেক্ষা করছে। তিনি স্মরণ করেন, ‘প্রথম খণ্ডের প্রথম পাতাটি উল্টানোর সঙ্গে সঙ্গেই আমি বুঝে ফেলেছিলাম, এটি কত অসাধারণ এক সম্পদ। আমি সঙ্গে সঙ্গে এমন সব কাহিনির রেখা দেখতে পাই, যেগুলো দীর্ঘদিন উপেক্ষিত ছিল বা খুব সামান্যই আলোচিত হয়েছিল।’
তিনি বলেন, তাঁর বই এসব সম্ভাবনার কেবল অল্প একটি অংশ অনুসন্ধান করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘এমন আরও অসংখ্য বিষয় রয়েছে, যেগুলো এখনো অন্যদের অনুসন্ধানের অপেক্ষায়।’
বিবিসি থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান








