বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত একটি ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন প্রখ্যাত পাপেট শিল্পী ও চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরাসরি নির্দেশও মানেননি তিনি। এরপর যা ঘটেছিল, তা আজও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নীতির প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থানের এক বিরল উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করা হয়।

সময়টা ১৯৮৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর। সেদিন বিটিভির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে রামপুরার বিটিভি ভবনে শুরু হয়েছিল সাত দিনব্যাপী রজতজয়ন্তী উৎসব। জাঁকজমকপূর্ণ সেই আয়োজনের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

উৎসব উপলক্ষে বিটিভি ভবনের প্রধান ফটকের পাশে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি বিশাল ম্যুরাল। বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরা সেই শিল্পকর্মের পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে ছিলেন তৎকালীন বিটিভির মহাপরিচালক মুস্তাফা মনোয়ার।

সে সময় রাষ্ট্রপতি এরশাদের লেখা গান বিটিভিতে নিয়মিত প্রচার হতো। রজতজয়ন্তীর সেই ম্যুরালেও তার একটি জনপ্রিয় গানের প্রথম দুটি লাইন খোদাই করার নির্দেশ দেন তিনি। তবে শিল্পকর্মের মৌলিক ভাবনা ও নান্দনিকতার সঙ্গে বিষয়টি সাংঘর্ষিক মনে হওয়ায় সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করেননি মুস্তাফা মনোয়ার।

উদ্বোধনের দিন রাষ্ট্রপতি এরশাদ ম্যুরালটি উন্মোচন করে দেখেন, সেখানে তার গানের কোনো অংশই নেই। এতে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে মুস্তাফা মনোয়ারকে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করেন। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তির রোষানলেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি এই গুণী শিল্পী।

ম্যুরাল উন্মোচনের পর বিটিভির মূল মিলনায়তনে শুরু হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিদের পাশাপাশি বিটিভির মহাপরিচালক হিসেবে মুস্তাফা মনোয়ারেরও বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতির আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

এতে অনুষ্ঠানে কিছু সময়ের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে উপস্থাপক ঘোষণা দেন, ‘অনিবার্য কারণবশত মুস্তাফা মনোয়ার বক্তব্য রাখতে পারছেন না। তার পক্ষে লিখিত ভাষণটি পাঠ করবেন আবদুল্লাহ আল মামুন।’

আরও পড়ুন:
অত্যাচারী পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধেও কথা বলতো মুস্তাফা মনোয়ারের পুতুল 
মুস্তাফা মনোয়ারের জানাজা মঙ্গলবার, নেওয়া হবে শহীদ মিনারে 

এরপর নাট্যব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আল মামুন মঞ্চে উঠে মুস্তাফা মনোয়ারের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এভাবেই শেষ হয় বিটিভির রজতজয়ন্তীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সেই বহুল আলোচিত অধ্যায়।

ঘটনার বহু বছর পেরিয়ে গেলেও এটি আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শিল্পীর নীতিগত অবস্থান, শিল্পের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার কাছে আপস না করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত হয়।

এমএমএফ