- আঙুর গাছ প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত ফল দেয়
- প্রতি কেজি আঙুর প্রায় ৪০০ টাকা
- ২৫০-৮০০ টাকা দরে বিক্রি হয় চারা
- ৩ হেক্টর জমিতে ৩০ জন কৃষক আঙুর চাষ করছেন
আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত রাজশাহী এবার বাণিজ্যিক আঙুর চাষেও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। একসময় বিদেশ থেকে আমদানি করা আঙুরই ছিল দেশের বাজারের ভরসা। তবে আধুনিক প্রযুক্তি, অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষকদের আগ্রহে এখন রাজশাহীর মাটিতেই উৎপাদিত হচ্ছে উন্নত মানের আঙুর। স্ট্রবেরি, মাল্টা ও ড্রাগন ফলের পর এবার আঙুর চাষেও সফলতা পাওয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় তরুণ উদ্যোক্তারা ঝুঁকছেন এই উচ্চমূল্যের ফল চাষে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কারিগরি সহায়তা এবং বাজারে ভালো দামের কারণে রাজশাহীতে দিনদিন বাড়ছে আঙুর বাগানের পরিধি।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজশাহীর অপেক্ষাকৃত শুষ্ক আবহাওয়া, পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং আধুনিক সেচব্যবস্থা আঙুর চাষের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। একবার বাগান স্থাপন করা গেলে একটি আঙুর গাছ প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত ফল দেয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে পরিচর্যা ব্যয় কম হলেও লাভের পরিমাণ অনেক বেশি। ফলে রাজশাহীর কৃষকেরা আঙুর চাষে ঝুঁকছেন।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হাসনিপুর গ্রামের তরুণ কৃষক ও প্রকৌশলী ইমাম হোসেন সাগরের আঙুর বাগান এখন এলাকাবাসী ও নতুন উদ্যোক্তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। বাগানে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সবুজ লতায় ঝুলে থাকা থোকায় থোকায় আঙুর। কোথাও সবুজ, কোথাও খয়েরি, আবার কোথাও গাঢ় বেগুনি রঙের টসটসে ফল। তার ৩ বিঘা জমির বাগানে বাইকুনুর, অ্যাপোলো, দাসুনিয়া, অস্ট্রেলিয়ান কিংসহ আটটি জাতের আঙুরের চাষ হচ্ছে। পরিচর্যা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিটি গাছেই মিলেছে আশানুরূপ ফলন।
আরও পড়ুন
মরুভূমির ‘মিষ্টি সোনা’ এখন পাবনার হিরুর বাগানে
ইমাম হোসেন সাগর জানান, যশোরে একটি সফল আঙুর বাগান দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন। পরে বাবা ও ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে আঙুর চাষ শুরু করেন। শুরুতে ২ বিঘা জমিতে প্রায় ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়। অনেকেই তখন নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু সঠিক পরিচর্যা ও ধৈর্যের ফলে এখন সেই উদ্যোগ সফল বাণিজ্যিক খামারে পরিণত হয়েছে।

চলতি মৌসুমে তার বাগানের ৩৬০টি গাছ থেকে উৎপাদিত হয়েছে ৭ হাজার ২১ কেজি আঙুর। বাজারমূল্যে যার দাম প্রায় ২১ লাখ টাকা। ফল বিক্রির পাশাপাশি গাছের কাটিং থেকে চারা উৎপাদন করেও বাড়তি আয় করছেন তিনি। গত ১ বছরে শত শত চারা উৎপাদন করে ২৫০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। শুধু চারা বিক্রি করেই বছরে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইমাম হোসেনের এই সফলতা দেখে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে কৃষক, শিক্ষার্থী ও নতুন উদ্যোক্তারা তার বাগান পরিদর্শনে আসছেন। অনেকেই পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি চারা নিয়ে নিজেদের জমিতে আঙুর চাষ শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। তাদের বিশ্বাস, সফল হলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
ইমাম হোসেনের প্রতিবেশী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শুরুর দিকে গ্রামের অনেকেই মনে করেছিলেন এ অঞ্চলে আঙুর চাষ লাভজনক হবে না। কিন্তু এখন প্রতিদিন বাগানে দর্শনার্থী আসছেন, আঙুর বিক্রি হচ্ছে এবং এলাকার অনেক তরুণ কৃষিকাজে আগ্রহী হচ্ছেন। এই বাগান শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।’
আরও পড়ুন
নয়নপুরী লটকনে সফল রোকনউদ্দিন, কলমেই বছরে আয় ৮ লাখ
আরেক প্রতিবেশী নাসিমা বেগম বলেন, ‘আগে এই জমিতে সাধারণ ফসল হতো। এখন আঙুর বাগান দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। এতে এলাকার পরিচিতি যেমন বেড়েছে; তেমনই স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’
এদিকে আঙুর চাষে সফলতার আরেকটি উদাহরণ তৈরি করেছেন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার বখতিয়ারপুর গ্রামের তরুণ রাহুল আমিন। রাজশাহী কলেজের এই শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে আঙুর চাষে সাফল্যের নজির গড়েছেন। তার সহযোগী হিসেবে আছেন একই গ্রামের আল আমিন। দুজনে মিলে প্রায় ৮ শতাংশ জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে বাইকুনুর জাতের আঙুরের বাগান গড়ে তুলেছেন। সফলতা পাওয়ায় ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আঙুর চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

বাগান ঘুরে দেখে অনেকেই সরাসরি মালিকের কাছ থেকে আঙুর কিনে নিয়ে যান। বর্তমানে প্রতি কেজি আঙুর প্রায় ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া আঙুরের চারা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন তারা। ফল ও চারা বিক্রি করে বর্তমানে ভালো আয় করছেন এই দুই তরুণ উদ্যোক্তা।
রহুল আমিন বলেন, ‘শুরুর দিকে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছিলেন। তবে ধৈর্য, পরিশ্রম ও সঠিক পরিচর্যার কারণে এখন ভালো উৎপাদন হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আঙুরের বাগান করার পরিকল্পনা আছে, যাতে অন্য তরুণেরাও এ চাষে আগ্রহী হন।’
আরও পড়ুন
আনার চাষে সফল শিবলী সাদিক, বাগানে আছে ৩০০ গাছ
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে ইউটিউব দেখে এবং আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে জেনে আঙুর চাষ শুরু করি। পাশাপাশি কিছু জমিতে পেয়ারার চাষও করছি। ফল বিক্রির পাশাপাশি কাটিং, কলম ও চারা বিক্রি করেও ভালো লাভ হচ্ছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ বাগান দেখতে আসেন। অনেকেই আগ্রহ নিয়ে আঙুরের চারা সংগ্রহ করছেন।’
দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাশতুরা আমিন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এভাবে আঙুর চাষ সম্ভব—এই তরুণ উদ্যোক্তাদের বাগান না দেখলে বিশ্বাসই হতো না। এটি আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার বিষয়। আরও বড় পরিসরে আঙুর চাষ হলে বিদেশ থেকে ফল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। তরুণেরা যদি আঙুরসহ অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফল চাষে এগিয়ে আসেন, তাহলে তাদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।’
দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী বলেন, ‘নিজ উদ্যোগে ব্যতিক্রমী এই আঙুর বাগান গড়ে তুলেছেন তরুণেরা। কৃষি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। অন্য কৃষকদেরও উদ্বুদ্ধ করছে।’

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলার তিনটি উপজেলায় প্রায় ৩ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩০ জন কৃষক বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ করছেন। অতীতে কয়েকবার আঙুর চাষের উদ্যোগ সফল না হলেও এবার অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত জাতের চারা এবং পলিশেড প্রযুক্তির কারণে ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে।
আরও পড়ুন
মাগুরার বাজারে আঁশফল, মৌসুমে বাড়ছে চাহিদা
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান বলেন, ‘রাজশাহীর আবহাওয়া ও মাটির বৈশিষ্ট্য আঙুর চাষের জন্য ক্রমেই উপযোগী হয়ে উঠছে। আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে পলিশেড ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে এখন বাণিজ্যিকভাবে আঙুর উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। আমরা কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছি। তরুণ উদ্যোক্তারা যেভাবে আঙুর চাষে আগ্রহী হচ্ছেন, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। ভবিষ্যতে পরিকল্পিতভাবে আবাদের পরিধি বাড়ানো গেলে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশি আঙুরের আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আঙুর চাষে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় পর্যায়ে আঙুরের উৎপাদন আরও বাড়ানো গেলে বিদেশ থেকে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং কৃষকেরাও অধিক লাভবান হবেন।’
এমওএইচএম/এসইউ








