মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ও আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্রিক) ব্যবহার করে দেশে যে কত বড় অপরাধের নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, শনিবার যুগান্তরের প্রতিবেদনে তা স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর লালবাগে ডিবি পুলিশের অভিযানে ২২ হাজার সচল সিমসহ চক্রের সদস্যদের গ্রেফতারের ঘটনাটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ডিস্ট্রিবিউশন হাউজের অসাধু কর্মকর্তা, রিটেইলার এবং আইটি বিশেষজ্ঞদের যোগসাজশে সাধারণ ও অসচেতন মানুষের আঙুলের ছাপ ক্লোন করে বা একাধিকবার নিয়ে যেভাবে হাজার হাজার সিম অবৈধভাবে সক্রিয় করা হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

জানা যায়, অসাধু রিটেইলাররা নানা অজুহাতে গ্রাহকের অজান্তেই তার আঙুলের ছাপের হুবহু ক্লোন বা ডিজিটাল ইমেজ তৈরি করে নিচ্ছে। এরপর সেই ক্লোন করা বায়োমেট্রিক ও এনআইডি ব্যবহার করে একের পর এক সিম সচল করা হচ্ছে, যা ভয়ংকর ডিজিটাল জালিয়াতি। কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি হওয়া এসব প্রি-অ্যাক্টিভেটেড সিম মূলত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের টাকা আত্মসাৎ, আন্ডারওয়ার্ল্ডের চাঁদাবাজি, মাদক চোরাচালান, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশের বাইরে অর্থ পাচারসহ রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বলা বাহুল্য, জনগণের করের টাকায় কেনা জাতীয় তথ্যভাণ্ডার ও বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি এভাবে খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে অরক্ষিত ও অপব্যবহারের শিকার হয়, তাহলে নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা এক বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে বাধ্য।

আমরা মনে করি, বিগত দিনে এ খাতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা বা মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ তদারকির অভাবই অপরাধীদের এতটা বেপরোয়া করে তুলেছে। এই ডিজিটাল অপরাধের নেটওয়ার্ক ও জননিরাপত্তার হুমকি পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে সরকারকে অবিলম্বে বহুমাত্রিক ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়া ও ডিভাইসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে অডিট করা তো বটেই, কোনো রিটেইলার গ্রাহকের এনআইডি বা আঙুলের ছাপের ডিজিটাল কপি কোনো ডিভাইসে সংরক্ষণ করলে শুধু তাকেই শাস্তি প্রদান নয়, সংশ্লিষ্ট অপারেটর কোম্পানিকেও বড় অঙ্কের জরিমানা এবং আইনি জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি একটি সহজ ও বিনামূল্যে অ্যাপসভিত্তিক সেবা চালু করাও এখন সময়ের দাবি। দেশের মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ও আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের আপসহীন অবস্থানের বিকল্প নেই।