ছাত্রলীগ নেতা স্বামীর জামিনের আশায় স্ত্রীকে বন্ধক রাখতে হয়েছিল স্বর্ণের চেইন। কিন্তু দুই লাখ টাকা নেওয়ার পরও জামিন করিয়ে দেননি এক আইনজীবী যুবলীগ নেতা। পরে জামিন হয়েছিল অন্য এক আইনজীবীর হাত ধরে। এভাবে নিজ দলের নেতাদের কাছেই প্রতারণার শিকার হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী। সম্প্রতি ছাত্রলীগের সাবেক দুই নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার পর দলের ভেতরে ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের আইনি অজ্ঞতা ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে জামিন করিয়ে দেওয়া কিংবা পুলিশ ও ডিসি প্রসিকিউশন ‘ম্যানেজ’ করার আশ্বাস দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দেশে ও বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগের এক শ্রেণির নেতা ও অসাধু আইনজীবীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার পরও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জামিন হয় না, ফেরত মেলে না টাকাও। তবে আইনজীবীরা বলছেন, জামিন দেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র আদালতের। পুলিশ বা প্রসিকিউশনকে টাকা দিয়ে জামিন নিশ্চিত করার কোনো সুযোগই নেই। কেউ যদি এ ধরনের কাজ করে তা স্রেফ প্রতারণা।

ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক নাহিয়ান আহমেদ বিপ্লব সম্প্রতি ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, গ্রেফতারের পর তার মা ও স্ত্রী আইনি পরামর্শ নিতে যুবলীগের কেন্দ্রীয় এক নেতার কাছে যান; যিনি আবার আইনজীবীও। সেখানে ডিসি প্রসিকিউশনের মাধ্যমে সহযোগিতার কথা বলে তাদের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নেওয়া হয়। বিপ্লবের দাবি, পরে ওই নেতা তার জামিন করিয়ে দেননি। অন্য একজন আইনজীবী জামিন করান। অথচ তার পরিবারের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। ওই টাকা জোগাড় করতে তার স্ত্রীর স্বর্ণের চেইন পর্যন্ত বন্ধক রাখতে হয়েছিল। তিনি বলেন, দলের দুঃসময়ে কর্মীদের পাশে না দাঁড়িয়ে তাদের কাছ থেকেই অর্থ নেওয়া হয়েছে।

একই ধরনের অভিযোগ করেন ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ জে রাজ। তিনি ফেসবুকে দাবি করেন, ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী বেনজির হোসেন নিশির জামিনে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে তার বাবার কাছ থেকে এক লাখ টাকা নেন। রাজধানীর কলাবাগান থানার সামনে তার উপস্থিতিতেই টাকা দেওয়া হয়েছিল। রাজের ভাষ্য, পরে জানা যায় প্রসিকিউশনে কোনো টাকাই দেওয়া হয়নি। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জামিন না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে তিনি নানা টালবাহানা করেন। একপর্যায়ে হুমকিও দেন। তার দাবি, একইভাবে আরও অনেক নেতাকর্মী প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

একাধিক ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা যুগান্তরের কাছেও দাবি করেন, বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন পলাতক নেতা কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তারা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে দ্রুত জামিন করিয়ে দেওয়া ও নতুন মামলায় ‘শোন অ্যারেস্ট’ না দেখানোসহ নানা আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে। টাকা নেওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিশ্রুত কোনো কাজ হচ্ছে না। পরে ভুক্তভোগীরা যোগাযোগের চেষ্টা করলে নানা অজুহাত দেওয়া হয়; এমনকি অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

তবে উল্লেখিত অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, আদালত বা পুলিশকে প্রভাবিত করার নামে অর্থ আদায় ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে পড়ে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

আওয়ামীপন্থি এক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, এই অভিযোগগুলোর কথা আমি জানি। এক শ্রেণির অসাধু আইনজীবী দলের নাম ভাঙিয়ে এসব অপকর্ম করছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং দলের জন্য বিব্রতকর। দলের দুঃসময়ে মামলা-হামলার মধ্যে থাকা নেতাকর্মীদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এমন অর্থ আদায় বা প্রতারণা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, প্রকৃত আইনি ব্যয় আর প্রতারণার নামে অর্থ আদায়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য আছে। যদি কেউ জামিন ও পুলিশ ম্যানেজের নামে অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তবে আওয়ামীপন্থি আরেক আইনজীবী বিষয়টি অস্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, দল এখনো কোনো আইনজীবী প্যানেল গঠন করেনি। ফলে যারা মামলা পরিচালনা করছেন, তারা মূলত স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করছেন। কিন্তু একটি মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ, নথি প্রস্তুত, জামিনের আবেদন, হাইকোর্টে যাতায়াত, আদেশের কপি নামানোসহ নানা ধরনের বাস্তব খরচ রয়েছে। এসব খরচ আইনজীবীদের ব্যক্তিগতভাবে বহন করা সবসময় সম্ভব নয়। তিনি বলেন, কেউ যদি দাবি করেন লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে, তাহলে সেটি প্রমাণের জন্য নথিপত্র প্রয়োজন। রাজনীতিতে নানা ধরনের অভিযোগ ও পালটা অভিযোগ থাকে। অনেক সময় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা ভুল বোঝাবুঝি থেকেও নানা কথা ছড়ায়। তাই কোনো অভিযোগকে সত্য ধরে নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ ও নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের ডিসি মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল যুগান্তরকে বলেন, প্রসিকিউশন কোনো আসামির বিরুদ্ধে ‘শোন অ্যারেস্ট’ দেখায় না। এটি সংশ্লিষ্ট থানা আবেদন করে। আর আদালত আদেশ দেন। আমরা শুধু থানা থেকে আসা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করি। কারও জামিন হবে কি হবে না, কিংবা শোন অ্যারেস্ট দেখানো হবে কি হবে না, এসব বিষয়ে প্রসিকিউশনের কোনো এখতিয়ার বা পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, তাই প্রসিকিউশনকে ম্যানেজ করার কথা বলে টাকা নেওয়ার যে অভিযোগ উঠছে, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। আমরা বিষয়টি যাচাই করে দেখব কারা এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।