টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার বৃহত্তর অংশ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বানের পানিতে ভেঙে গেছে মানুষের ঘরবাড়ি, ভেসে গেছে মাছের খামার, গৃহপালিত পশু ও হাঁস-মুরগি। অনেকেই হারিয়েছেন ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল সব কিছু। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নবনির্মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের সাতকানিয়া অংশে অপর্যাপ্ত কালভার্ট এবং বাঁশখালী উপজেলায় অবৈধ-অকেজো স্লুইসগেটের কারণেই পানি নামতে পারেনি। এসব প্রতিবন্ধকতার কারণেই দুই উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এ বন্যায় দুই উপজেলার অন্তত সাড়ে তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়নের ১১৭টি ওয়ার্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৭ জুলাই রাত থেকে সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের তেমুহনী গ্রামে পানি ঢুকতে শুরু করে। পরদিন এলাকায় পানি বাড়তে থাকে। বৃহস্পতি ও শুক্রবার পানি ছিল সবচেয়ে বেশি। শনিবার থেকে পানির উচ্চতা কমেছে। স্থানীয়রা জানান, বান্দরবান থেকে সাঙ্গু নদী বেয়ে আসা পানি ও ভারি বৃষ্টিতে পানির পরিমাণ বেড়ে যায়। যা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের সাতকানিয়া অংশে পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকা এবং নয়া খাল, ডলু খাল ও গরলা খালে পানি নামার ব্যবস্থা না থাকায় ভয়াবহ বন্যায় রূপ নিয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালেও বন্যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের সাতকানিয়া অংশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বন্যার পানির চাপে প্রায় এক কিলোমিটার রেললাইন উঁচু-নিচু ও বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া রেলপথের উজানের ৫ ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের ঘরবাড়ি ডুবে গিয়েছিল। তখনো এলাকাবাসী রেললাইনে অপর্যাপ্ত সেতু ও কালভার্টকে দায়ী করেছিলেন। এরপর পর্যাপ্ত কালভার্ট-ব্রিজের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে এলাকাবাসী। পরবর্তীতে সাতকানিয়ার তেমোহনী অংশে বন্যায় তলিয়ে যাওয়া এলাকায় নতুন করে চারটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘বান্দরবান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি নামার জন্য সড়কপথের নিচে পাঠানি পুল, নয়া পুল, ২ নম্বর ব্রিজ, নোয়া খালের ব্রিজ ও পেয়ারঘাটাসহ ৭টি সেতু রয়েছে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রেললাইন। পর্যাপ্ত কালভার্ট ও সেতু না থাকায় এই রেললাইন তৈরি হওয়ার পর থেকে ভয়াবহ বন্যায় পুরো সাতকানিয়া তলিয়ে যাচ্ছে।’
সাতকানিয়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার খোন্দকার মাহমুদুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, ‘অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সাতকানিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পার্শ্ববর্তী বান্দরবানের পানিও সাতকানিয়া দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানি নামতে না পারায় উপজেলার ১১৭টি ওয়ার্ডের প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের কাছে শুকনো খাবার পৌঁছানো হয়েছে।’ তবে তিনি রেললাইনে পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকার কারণে বন্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এ কথা স্বীকার বা অস্বীকার কিছুই করেননি।
বাঁশখালীতে অবৈধ স্লুইসগেট : ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বাঁশখালীর মোট আয়তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। জানা গেছে, বাঁশখালীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে প্রায় আড়াশ’ স্লুইসগেট রয়েছে। যার মধ্যে ৮৯টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের। বাকি দেড় শতাধিক স্লুইসগেট লবণ ও মাছ চাষের সুবিধার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পরও মাছ চাষিরা ঘের বাঁচাতে স্লুইসগেটগুলো বন্ধ করে রেখেছে। পরে গ্লামারা, সরল, বৈলছড়ি, পুঁইছড়ি, চাঁপাছড়ি, খানখানাবাদ, সাধনপুর ও ছনুয়া এলাকার স্লুইসগেটগুলো প্রশাসনের পক্ষ থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় পানি যাওয়ার মতো সুযোগ ছিল না। এ কারণে রোববার পর্যন্ত প্রতিটি ইউনিয়নে কম-বেশি পানি উঠেছে। প্রায় এক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। পরে আমরা জানতে পারি, এই এলাকায় পানি ধরে রাখার জন্য বেশ কিছু অবৈধ স্লুইসগেট রয়েছে। সেগুলো খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করায় পানি নামতে শুরু করেছে।’








