দেশজুড়ে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবা, আইস, গাঁজা, ফেনসিডিল কিংবা হেরোইন। তবুও থামেনি মাদকের ভয়াবহতা; বরং আরও বেড়েছে। এখন অলিগলিতে মিলছে মাদক। পাওয়া যাচ্ছে হোম ডেলিভারিও। প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি কুরিয়ার ও ডার্কওয়েবের মাধ্যমে আসা আইস ও এলএসডির মতো নতুন প্রজন্মের ভয়ংকর সব সিনথেটিক মাদকের বিস্তারে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে তরুণরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সীমান্ত নজরদারি, দুর্বল গোয়েন্দা সমন্বয়, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা এবং চক্রের মূল হোতাদের ধরতে না পারা। তাদের মতে, দেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ মাদক আসে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও আইস এবং ভারত থেকে আসে গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, ট্যাপেন্টাডল, কেটামিনসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় ওষুধ। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার ও মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। দীর্ঘ এই সীমান্তের সব অংশে সমান নজরদারি নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মেট্রো (দক্ষিণ) কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মানজুরুল ইসলাম বলেন, সীমান্ত এলাকায় পর্যাপ্ত জনবল, লজিস্টিক ও গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে মাদকের চালান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে যৌথ অভিযান পরিচালনার পরও পুরোপুরি মাদক প্রবেশ ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। তার মতে, সীমান্তের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং ডার্ক ওয়েবভিত্তিক নতুন নেটওয়ার্কও এখন মাদক নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তুলছে।

তবে বিজিবির দাবি, সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে মাদক পাচার প্রতিরোধের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিজিবির এক কর্মকর্তা জানান, গেল এক বছরে প্রায় ৯২৬ কোটি টাকা মূল্যের মাদক জব্দ করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৮৫০ জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তার মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সীমান্তে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিমানবন্দর, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস ও পার্সেল ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করছে আইস, এলএসডি, কোকেন ও বিভিন্ন সিনথেটিক মাদক। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত সিন্ডিকেট সদস্যরা অনলাইনে অর্ডার নিয়ে কুরিয়ার ও পার্সেল সার্ভিস ব্যবহার করে এসব মাদক দেশে পাঠাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ পণ্য, খেলনা, বই কিংবা ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে মাদক পাঠানো হচ্ছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণে আরেকটি বড় বাধা বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তা মো. মানজুরুল ইসলাম বলেন, মাদক মামলার নিষ্পত্তি হতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লেগে যায়। ফলে অনেক আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি সাজা ভোগের পর বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের ঘাটতির কারণে অনেকেই আবার এই চক্রে ফিরে যায়।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধু মাদক জব্দ কিংবা খুচরা কারবারিকে গ্রেফতার করে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের পথ বন্ধ করতে হবে, বিমানবন্দর ও কুরিয়ার ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাদক সিন্ডিকেটের অর্থদাতা ও মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তার মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, দ্রুত বিচার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং তরুণদের জন্য বিকল্প সুযোগ সৃষ্টি ছাড়া মাদকের মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম স্বীকার করেন, অভিযানে সাধারণত হাতেনাতে ধরা পড়ে খুচরা বিক্রেতারা। কিন্তু অর্থদাতা, আমদানিকারক ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ অনেক কঠিন। ফলে তারা অধিকাংশ সময় আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়।