হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। শুক্র ও শনিবার দুই পক্ষ পালটাপালটি হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, হরমুজে চলাচল করা একটি জ্বালানিবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। এজন্য তারা ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। অপরদিকে ইরান বলছে, হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে তারা হামলা চালিয়েছে।
উত্তেজনা বেড়েছে লেবাননেও। সেখানে দেশটির সরকার ও ইসরাইলের মধ্যে একটি চুক্তি হলেও তা মানতে সম্মত নয় হিজবুল্লাহ। এ অবস্থায় নতুন করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে যাচ্ছে। হুমকিতে পড়েছে শান্তিপ্রক্রিয়া। সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে, সেটি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের হামলাকে সমঝোতা চুক্তির লঙ্ঘন বলে বর্ণনা করেছে ওয়াশিংটন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা হলেও বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাবক ও জ্বালানি পরিবহণের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজের নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে উঠে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে। ইরান বলছে, তাদের জয়সীমায় হওয়ায় তারা এটি নিয়ন্ত্রণ করবে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের আগের অবস্থায় হরমুজকে চাইছে। সম্প্রতি ওমান হরমুজে নতুন একটি পথ ঘোষণা করে। এ নিয়ে তেহরান হুঁশিয়ারি দেয়-কেবল তাদের অনুমতি নিয়েই হরমুজ পার হতে হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে শনিবার আলজাজিরা জানায়, দক্ষিণ উপকূলে হামলার প্রতিবাদে ইরানের সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। বাহরাইন জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে বিভিন্ন এলাকায় ড্রোন হামলা হয়েছে। এটিকে তারা এই এলাকায় উত্তেজনা নিরসন প্রচেষ্টার ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে বর্ণনা করেছে। বাহরাইনে হামলার নিন্দা জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত।
এ অবস্থায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা চুক্তির পঞ্চম অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। এতে উল্লেখ আছে-হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে প্রশাসনিক বিষয়টি নির্ধারণ করবে ওমান ও ইরান।
এর আগে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স বা ইউকেএটিও জানিয়েছে, তাদের একটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালিতে হামলার শিকার হয়েছে। অজ্ঞাত বস্তু এসে এটিকে আঘাত করে। এতে ট্যাংকারটির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে হিজবুল্লাহকে না জানিয়ে ইসরাইলের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে লেবানন সরকার। বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ। সংগঠনটির নেতা নাইম কাশেম বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে লেবাননের চুক্তি একটি চরম ভুল। এক বিবৃতিতে নাইম কাশেম এ চুক্তিকে অপমানজনক, লজ্জাজনক ও সার্বভৌমত্বের আত্মসমর্পণ বলে বর্ণনা করেছেন। এ অবস্থায় শনিবার লেবাননে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরাইল।
হরমুজ প্রণালিতে ‘নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার’ চেষ্টা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের : আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব রোমের আন্দ্রেয়া দেসি মনে করেন, সাম্প্রতিক উত্তেজনা থেকে বোঝা যায়, ‘ওই সমঝোতা স্মারকটি অত্যন্ত নাজুক এবং যে কোনো মুহূর্তে তা ভেস্তে যেতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘স্পষ্টতই, পরিস্থিতি যাতে আরও বড় কোনো সর্বাত্মক সংঘাতে রূপ না নেয়, তা নিশ্চিত করা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষেরই স্বার্থের অনুকূল।’
দেসি মনে করেন, সমঝোতার আলোচনার এ পর্যায়ে ‘এমন এক নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, যা আমরা বারবার দেখতে পাব, বিশেষ করে ৩০ বা ৬০ দিনের মধ্যে।’ এ বিশ্লেষক বলেন, ‘প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব বজায় রাখার সক্ষমতা যে তাদেরই হাতে, তা প্রমাণ করার বিষয়ে উভয় পক্ষেরই সুনির্দিষ্ট স্বার্থ রয়েছে। ফলে এর মধ্য দিয়ে এমন এক উত্তেজনা ও সম্ভাব্য সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা যে কোনো মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ঘাঁটিগুলো ইসরাইলে সরানোর কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র, দাবি গোয়েন্দাদের : মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর কয়েকটি ইসরাইলে সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে মার্কিন প্রশাসন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাহরাইনে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন নৌঘাঁটি সংস্কারের পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে কুয়েত ও সৌদি আরবে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনা হতে পারে। মার্কিন প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানান, ওয়াশিংটন চাইলে এই অঞ্চলের কিছু সামরিক ঘাঁটি ইসরাইলে স্থানান্তর করতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পালটা হামলা চালায় তেহরান। এতে বাহরাইনে পঞ্চম মার্কিন নৌবহরের সদরদপ্তরটি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

