মূল্যস্ফীতির কশাঘাত থেকে সাধারণ মানুষকে রেহাই দিতে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার পরিবর্তে ৪ লাখ টাকা করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। ফলে বছরে ৬ লাখ টাকার কম বেতন বাবদ আয় (এক-তৃতীয়াংশ কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত) থাকলে কর দিতে হবে না। তবে রেয়াতের সীমা কমানো এবং সঞ্চয়পত্র, সরকারি সিকিউরিটিজ, এফডিআর-এর সুদ থেকে কেটে নেওয়া উৎসে করকে চূড়ান্ত কর দায়ের বদলে অগ্রিম কর হিসাবে গণ্য করায় করদাতাদের ওপর করের বোঝা অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

এছাড়াও প্রস্তাবিত বাজেটে নিয়মিত হারে কর দিয়ে জমি-ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য দেখানোর যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, সেটিও বাতিল হচ্ছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে অর্থনীতির মূলধারায় আনতে ব্যাংক হিসাব খোলায় করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরের (টিআইএন) বাধ্যবাধকতাও বাতিল করা হচ্ছে। তাছাড়া আগের মতোই থাকছে শেয়ারবাজারের লভ্যাংশ আয়ের করহার। এসব পরিবর্তন এনে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে অর্থবিল পাশ হতে যাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে। মূল্যস্ফীতির কশাঘাত থেকে সাধারণ মানুষকে রেহাই দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরে এই সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়ল। এছাড়াও জমি-ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য দেখানোর বিশেষ বিধান এবং ব্যাংক হিসাব খোলায় টিআইএন-এর বাধ্যবাধকতাও বাতিল হচ্ছে।

এ বিষয়ে কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া যুগান্তরকে বলেন, করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়ানোয় নিু-আয়ের সাধারণ করদাতারা সুফল পাবেন। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে ঘোষিত করহারে পরিবর্তন না আনলে ব্যবসা, কৃষি, আর্থিক পরিসম্পদ বা বাড়ি ভাড়া বা অন্য কোনো উপায়ে আয় করলে তাদের বাড়তি কর দিতে হবে। কেননা ন্যূনতম করহার ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্র সুদ থেকে কেটে নেওয়া উৎসে করকে চূড়ান্ত কর দায়ের বদলে অগ্রিম কর হিসাবে গণ্য করার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের বিনিয়োগের সীমা ১৫ থেকে ১০ শতাংশ করা এবং মেয়াদকাল পর্যন্ত ধারণের বাধ্যবাধকতার কারণে করের বোঝা বাড়তে পারে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সাধারণত ২-৩ বছর পরপর ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে থাকে এনবিআর। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়। ২০২০-২১ সালে করমুক্ত আয়ের সীমা আড়াই লাখ থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ লাখ ২০ লাখ হাজার থেকে বাড়িয়ে আড়াই লাখ টাকা করা হয়।

গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমায় কোনো ছাড় দেয়নি। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষিত ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বহাল রাখে। এমনকি ২০২৮-২৯ থেকে ২০৩০-৩১ পর্যন্ত আগামী ৩ অর্থবছরে করমুক্ত সীমা কত হবে, সেটিও প্রস্তাবিত বাজেটে উল্লেখ করে দেয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের করমুক্ত সীমা ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরের করমুক্ত সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থবিলের মাধ্যমে আয়কর আইনের প্রথম তফসিলে সংশোধন এনে ‘স্বতঃপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শন’ নামে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে নিয়মিত হারে কর দিয়ে বিনা প্রশ্নে জমি-ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য প্রদর্শনের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়। অতীতে কোনো ব্যক্তি জমি, বিল্ডিং, অ্যাপার্টমেন্ট কেনার সময় দলিলে প্রকৃত মূল্য গোপন করলে নতুন বিধান অনুযায়ী তা রিটার্নে প্রদর্শন করতে পারবে। এজন্য তাকে ক্রয়কৃত স্থাবর সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য ও দলিল মূল্যের পার্থক্যের ওপর নির্ধারিত হারে কর দিতে হবে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য যা ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে কোনো বিক্রেতা জমি, বিল্ডিং, অ্যাপার্টমেন্ট কেনার সময় দলিলে প্রকৃত মূল্য গোপন করলে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য ও দলিল মূল্যের পার্থক্যের ওপর বিক্রেতাকে ১৫ শতাংশ মূলধনি কর দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়। এক্ষেত্রে কিছু শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন: স্বতঃপ্রণোদিত ঘোষণা পূর্বে আয়কর আইন অনুযায়ী ক্রেতা বা বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে প্রদেয় করের ২০ শতাংশ জরিমানা হিসাবে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হবে। তাছাড়া স্বতঃপ্রণোদিত ঘোষণার আগে বাংলাদেশের কোনো আদালত ঘোষণাকারীকে অপরাধমূলক কার্যকলাপের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকে, তাহলে ওই ব্যক্তি আইনের এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন না। বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে অর্থবিলের এই বিধানটি বাতিল করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা প্রদর্শনের সুযোগ দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। নানা সমালোচনার মুখে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেটি ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় এসে অন্তর্বর্তী সরকার এই সুযোগ বাতিল করে দেয়।

পাশাপাশি শেয়ারবাজারের স্বার্থে লভ্যাংশ কর আগের মতোই ২০ শতাংশ রাখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থবিল সংশোধনের মাধ্যমে লভ্যাংশের এই করহার বিলুপ্ত করা হয়। ফলে লভ্যাংশ আয়ের ওপর নিয়মিত করপোরেট করহার প্রযোজ্য হয়। যেমন: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংককে সাড়ে ৩৭ শতাংশ এবং অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ কর দিতে হয়। বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর পুরোপুরি মওকুফ রয়েছে।