প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন ধাপে উন্নীত করার ঘোষণা এসেছে। দুই দেশের জনগণের ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ গড়ার স্বার্থে অংশীদারত্বের পাশাপাশি আলোচিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর উন্নয়নে আগ্রহ দেখিয়েছে বেইজিং। চীন সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শুক্রবার সকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়। আলোচনায় শি জিনপিং বলেছেন, বিশ্বে যে কোনো পরিবর্তনই আসুক না কেন চীন বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত ভালো বন্ধু,’ ‘সুপ্রতিবেশী’ আর ‘ভালো অংশীদার’ হিসাবেই থাকবে। দুই শীর্ষ নেতা প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি একান্তেও কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশ-চীন বহুমাত্রিক সম্পর্ক পরিণত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে।
প্রধানমন্ত্রীর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে ১৪ দফার যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। এর পাশাপাশি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তারেক রহমান ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর বিবৃতি প্রচার করে।
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রথমবারের মতো চীন সফর শেষে তারেক রহমান শুক্রবার রাতে বেইজিং থেকে ঢাকায় ফেরেন। এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিয়েনআনমেন স্কয়ারে চীনের বীরদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এরপর বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজি। এরপর প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বৈঠক করেন। বেজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফরের শেষ কর্মসূচি ছিল চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) জাদুঘর পরিদর্শন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি : চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে দুই শীর্ষ নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চীন সব সময় বেইজিং-ঢাকা সম্পর্কের উন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ নীতিতে অটল রয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি চীনের সমর্থন অব্যাহত রাখার কথাও জানান চীনের প্রেসিডেন্ট। সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পর্ক জোরদার, কৌশলগত যোগাযোগ গভীর করা, রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং দুই দেশের নিজ নিজ মৌলিক স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়গুলোতে একে অপরকে সমর্থন অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত বলেও উল্লেখ করেন শি জিনপিং।
চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে শাসন কার্যক্রম পরিচালনায় সমর্থন করে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে উচ্চমানের অঞ্চল ও পথের উদ্যোগে (বিআরআই) সহযোগিতা এগিয়ে নিতে প্রস্তুত। বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযুক্তি আরও জোরদারের লক্ষ্যে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
বাংলাদেশ স্বীকার করে যে তাইওয়ান চীনের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যে কোনো ধরনের ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবের কর্তৃত্ব দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। আধুনিকায়নের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় পরিসরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ জোরদার, অঞ্চল ও পথের উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়া এবং অর্থনীতি ও বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা ও বিনিময় বাড়ানোর প্রত্যাশা করে।
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডরের প্রস্তাব বেইজিংয়ের : যোগাযোগ ও অর্থনীতির ‘ব্যাপ্তি বাড়াতে’ বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব আবারও সামনে এনেছে বেইজিং। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে কাজ করারও আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন সাংবাদিকদের জানান, গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে এই প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
বৈঠকের পর বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, চীন চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। এই বন্দরের আধুনিকায়ন করে কীভাবে এটাকে আমরা একটা আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে পারি, যেটা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, অন্যান্য দেশের জন্যও সেবা নিশ্চিত করবে, সেটা নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরকে উন্নত করা এবং আরও বেশি আধুনিকায়ন করতে চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
মাহ্দী আমিন জানান, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কীভাবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োগ করা যায়, সে বিষয়ে চীন সহায়তা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান। ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে এবং অন্যান্য সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের জন্য দ্বার উন্মোচন করতেও আগ্রহী চীন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আমরা পিপল টু পিপল কানেক্ট জোরদার করতে চাই। সংস্কৃতি, মিডিয়া, টেকনোলজি, সামগ্রিকভাবে নলেজ ট্রান্সফার এবং এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন নিয়ে আমরা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও বাড়াতে চাই। এসব বিষয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।’
যৌথ ইশতেহার ঘোষণা : ১৪ দফার যৌথ ইশতেহারে বলা হয়েছে, দুই পক্ষ সম্পর্ক পরের ধাপে উন্নীত করতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দুই পক্ষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপের একটি প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়। পাশাপাশি কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ২+২ সংলাপের প্রক্রিয়া চালু করা যায় কিনা, সেই সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়।
তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীন তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বাংলাদেশকে সহায়তা ও সমর্থন দেবে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই ও সংশ্লিষ্ট কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা জোরদার করবে চীন, যাতে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা যৌথভাবে রক্ষা করা যায়।
বাংলাদেশকে ১০০ শতাংশ শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়ায় চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়, যা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে। দুই পক্ষ যৌথভাবে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নিতে সম্মত হয়। চীন ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অংশীদার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের আবেদনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে।
বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে ঐকমত্য চীন-মালয়েশিয়া : শুক্রবার রাতে মালয়েশিয়া ও চীন সফর থেকে ফিরে ঢাকার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মাহ্দী আমিন। বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার জন্য চীন ও মালয়েশিয়া ঐকমত্য পোষণ করেছে বলে জানান তিনি। মাহ্দী আমিন বলেন, আমরা অভিভূত হয়েছি; যেভাবে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার প্রধানকে সম্মান ও ভালোবাসা দিয়েছে, লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু প্রধানমন্ত্রী নয়, বাংলাদেশের জন্য বিশাল গৌরবের বিষয়। যখন একজন সরকারপ্রধানের ক্ষমতার উৎস হয় জনগণ, তখন কীভাবে সেই সম্মান এবং আত্মমর্যাদা বিশ্ব দরবারে ফুটে ওঠে আমরা সেটি দেখেছি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন ও মালয়েশিয়া সফর শেষে শুক্রবার রাত পৌনে ৮টার দিকে ঢাকায় পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীরাও একই ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্য, উপদেষ্টা, সংসদ-সদস্য এবং সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারাও বিমানবন্দরে বিএনপি চেয়ারপারসনকে স্বাগত জানান। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে বিমানবন্দরে কোনো নেতাকর্মীর উপস্থিতি দেখা যায়নি।

