মালয়েশিয়া ও চীন সফরে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে জাতীয় সংসদ। শনিবার সকালে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে এ প্রস্তাব পাশ হয়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত ছিলেন না।
পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের স্বার্থ দেখার জন্য। আমাদের দলের অবস্থান থেকে আমরা একটি স্লোগান ব্যবহার করি, সেটি হচ্ছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘বাংলাদেশ প্রথম’। তিনি বলেন, আমি আমার অবস্থান থেকে চেষ্টা করেছি দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলার এবং সেই স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। এখানে আমাদের কারোরই ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নেই। ভালো কোনো কিছু অর্জন হয়ে থাকে, এটি বাংলাদেশের অর্জন। এ সফরের মাধ্যমে যদি দেশের মানুষের কোনো অর্জন হয়ে থাকে, সেটি দেশের মানুষের অর্জন। দেশের জন্য, দেশের মানুষের পক্ষে কাজ করার জন্য উৎসাহ দেওয়ায় বিরোধীদলীয় নেতাসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
ধন্যবাদ প্রস্তাব পাশের সময়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদে ছিলেন না। দুপুর ১টার কিছু আগে তিনি সংসদে প্রবেশ করলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ধন্যবাদ প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়টি তাকে জানান। স্পিকার বলেন, এই সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বক্তব্যের মাধ্যমে আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাশ করেছে। আপনার সম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরের ফলে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সবাই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশে অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিকে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন, সেজন্য আপনাকে এ সংসদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
এর আগে ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এ সফরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে। অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) এ সফরে অনেক চুক্তি করেছেন। দুই দেশের সঙ্গে পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্বদানের পরে জনগণের নির্বাচিত আমাদের নেতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নিজের একটা অবস্থান তৈরি করে ফেলেছেন। বাংলাদেশের মানুষ তার সম্পর্কে ধারণা সৃষ্টি করেছেন, তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জনতার কল্যাণে কাজ করছেন। পুরোনো সব খারাপ বাদ দিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন।
ফ্যাসিবাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশে যাওয়ার সময় ও দেশে ফিরে সংবর্ধনা নিতেন উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী এটি বন্ধ করেছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন কোনো ধরনের সংবর্ধনা দেওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে ১৭টি এমওইউ হয়েছে। গণচীনের প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেছেন, অত্যন্ত হৃদ্যতার সঙ্গে এসব বৈঠক হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও গণচীনের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তারা তাদের ভূমিকা অক্ষুণ্ন রাখবেন। শুধু তাই নয়, তারা এটাকে আরও বাড়াবেন, সম্প্রসারিত করবেন। আমাদের যে সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধানে চেষ্টা করবেন, এমনকি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন। সে ব্যাপার উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছেন। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর জন্য সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব আনেন মির্জা ফখরুল।
পরে প্রস্তাবটির বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কালচারাল পরিবর্তন প্রধানমন্ত্রী শুরু করেছেন। উনি যাওয়া বা আসার সময় বিমানবন্দরে হাজার লোকের সংবর্ধনা করেননি। এটা বিরাট কালচারাল পরিবর্তন বাংলাদেশে। প্রধানমন্ত্রী একটা মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন, আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতি কী হবে।
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ সফর ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করে, আমাদের দেশের সঙ্গে প্রতিটি দেশের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক স্বার্থ, কারও হস্তক্ষেপ নয় এবং আমাদের নিজস্ব সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। প্রধানমন্ত্রী সফরে সেটা প্রমাণ করেছেন। আমাদের অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বেঞ্চমার্ক নিশ্চিত করেছেন, যেটা বিএনপির রাজনীতিতে সব সময় ছিল। যেটা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্টাবলিশ করেছেন-প্রত্যেকটা দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে এ মানদণ্ডের ওপর।
মালয়েশিয়াতে আমাদের শ্রমবাজার, এনার্জি এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, চায়নার সঙ্গে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন স্বার্থ, তারা আমাদের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং এটাকে কিভাবে বাংলাদেশের স্বার্থে, চায়নার সঙ্গে বাণিজ্যিক ঘাটতি কিভাবে কমানো যায়, রপ্তানি বাড়াতে পারি সেই ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ সফরে বেঞ্চমার্ক স্থাপন করেছেন। এটা আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতি শুধু নয়, বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কি হবে, তা নিশ্চিত করেছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ধন্যবাদ প্রস্তাব সমর্থন করে বলেন, এ দেশটা সবার। আমরা সবাই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কথা বলে থাকি। আমরা সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি দেখতে চাই, বাস্তবায়ন করতে চাই। এক্ষেত্রে বিরোধী দল হিসাবে আমাদের যেটুকু করণীয় আমরা সরকারকে আশ্বস্ত করছি আমরা সব সহযোগিতা করব। সবকিছুর ওপর আমাদের প্রিয় দেশ। যে দুটি দেশের মধ্য দিয়ে তার এ সফর শুরু হলো, দুটি দেশই আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু, পরীক্ষিত বন্ধু।
তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের রাজনীতিতে আছি। ভালো হয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে বিদেশের সঙ্গে যতগুলো মৌলিক চুক্তি সম্পাদিত হবে তা এ সংসদে নিয়ে আসা। সংসদের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এই সাড়ে তিনশ মানুষ সারা দেশের ১৮ বা ২০ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছি। তারা যখন জানবেন, এর মধ্য দিয়ে সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি হবে। আমরা সবাই বলি ও চাই, আমাদের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে। আমি আশা করি, তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সেই সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। আমি আরও আশা করি, আমাদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে কেউ হস্তক্ষেপ করুক, এটা আমরা কখনো মেনে নেব না। দেশের স্বার্থ আগে। তারপরে সমঝাতা স্মারক বা চুক্তি যাই হোক সেটা হবে দুই দেশের স্বার্থের ভিত্তিতে। আমরা কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাই না। কিন্তু আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে চাই না। এ ভারসাম্য রক্ষা করেই আগামীর পলিসি যেন পরিচালিত হয়। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু এবং তার সরকারের সফলতা কামনা করেন। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এ সংসদ যেন সব কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়। এ সংসদকে এড়িয়ে কিছুই যেন না হয়। সবকিছু হোক সংসদের ভেতরে। এ সংসদ আলো ছড়াক। আগামী দিনে জনগণ সরকারি দল ও বিরোধী দলের কার্যক্রমকে বিচার করে তারাই সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে সরকারি দল সব কৃতিত্ব নেবে আর বিরোধী দল শুধু বিরোধিতা করবে-এ সংস্কৃতি আমরা সমর্থন করি না।
পরে প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। প্রস্তাবে বলা হয়, ‘সংসদের অভিমত এই যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়া এবং চীন সফরে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য এই মহান সংসদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।’ কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।
২১-২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার রাতে প্রধানমন্ত্রী চীন থেকে দেশে ফেরেন।

