প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যম থেকে শুরু করে অনলাইন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে। আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হলো, বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসাবে তারেক রহমানের ভারত সফর না করা। ভারত সফর দিয়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের বিদেশ সফর শুরু হবে, এটাই এতদিনের রেওয়াজ ছিল। ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে নিকবর্তী প্রতিবেশী হিসাবে ভারতও হয়তো তাই আশা করেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী, এতদিনের রেওয়াজ ভঙ্গ করে তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া গেলেন। বাংলাদেশের নাগরিকরা মনে করেন, এতদিন ভারতের সন্তুষ্টির জন্যই এ প্রথা চালু ছিল। এবার তার ব্যতিক্রম ঘটল।
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পর ভারতই প্রথম তারেক রহমানকে সে দেশে সফরের নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল। অথচ তিনি ভারত সফরে না গিয়ে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মধ্য দিয়ে তার বিদেশ সফর শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরগুলোর মধ্যে চীনকে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান একটি নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের বার্তা দিতে চেয়েছেন বলে অনেক কূটনীতিবিদরা মনে করছেন। ভারত সফরের আগে এ সফরকে বাংলাদেশ সরকারের ‘বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি’র প্রকাশ হিসাবে তারা দেখছেন। তাদের মতে, এ সফরের মাধ্যমে নতুন সরকার দেখাতে চাইছে যে, ঢাকা এখন আর কোনো একক আঞ্চলিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ধারণা হলো, শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ ভারতের কৌশলগত বলয়ের মধ্যে আটকে থাকলেও দুদেশের সম্পর্ক বেশ গভীর ছিল। এক্ষেত্রে সীমান্ত চুক্তি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বিদ্যুৎ আমদানি, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার কথা উল্লেখ করা যায়। তবে ভালো সম্পর্ক থাকলেও বাংলাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভারত ছাড় দেয়নি। তিস্তা পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা এবং বাণিজ্য বৈষম্যের মতো বিষয়গুলোর ব্যাপারে ভারতের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। বর্তমানে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ সবার সঙ্গেই সমান্তরাল সম্পর্ক জোরদার করার পথে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ চেষ্টা করছে, চীন থেকে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাজার ও প্রযুক্তি এবং ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা; এ তিনটিকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসাবে দেখলে হবে না। এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনীতি, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পুনর্গঠন এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক অর্থনীতি, অবকাঠামো, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। এ সফর দুদেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করারই ইঙ্গিত।
চীন ঐতিহ্যগতভাবে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করে। তবে আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক বিনিময়, মিডিয়া সহযোগিতা, শিক্ষা এবং প্রযুক্তি সহযোগিতার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে চীন সাধারণত বাংলাদেশের যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তার সঙ্গে কাজ করার নীতি অনুসরণ করে। চীনের মূল লক্ষ্য আদর্শিক নয়; বরং কৌশলগত ও অর্থনৈতিক।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের অবদান ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত একদশকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং উন্নয়ন সহযোগীতে পরিণত হয়েছে। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের পর থেকে অসংখ্য অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এখনো বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক শুধু উন্নয়ন ঋণ বা অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং উৎপাদন খাতেও বিস্তৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় চীনের ভূমিকা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণে চীন অন্যতম প্রধান অংশীদার। বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের একটি বড় অংশই চীনা উৎস থেকে আসে। যুদ্ধজাহাজ, মিসাইল ব্যবস্থা, সাঁজোয়া যান, প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম এবং বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চীনের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও চীনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে চীন থেকে ‘জে-টেন সিই’ যুদ্ধবিমান কেনার কথা চলছে, যা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে। চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণও রয়েছে। প্রথমত, পশ্চিমা অস্ত্রের তুলনায় চীনের সামরিক সরঞ্জামের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে চীন অধিক নমনীয়তা প্রদর্শন করে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ বাস্তবায়নে দ্রুত ও সাশ্রয়ী আধুনিকায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
তবে এ সহযোগিতা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে তার নিরাপত্তাবলয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে বিবেচনা করে এসেছে। ফলে বাংলাদেশের সামরিক ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব বৃদ্ধির কারণে নয়াদিল্লিকে নতুন করে হিসাব কষতে হবে।
তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে বাংলাদেশ সরকারের তরফে জানানো হয়েছে। এ সমঝোতা চুক্তিগুলোর মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সবুজ উন্নয়ন, গণমাধ্যম এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা বৃদ্ধি। একই সঙ্গে তিস্তা মেগা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তাসহ নদী ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা নিয়ে চীনের সঙ্গে ঐকমত্য হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি স্থানান্তর, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগের পাশাপাশি একটি জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যান নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব দিয়েছে চীন। পাশাপাশি চীন চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন করে কীভাবে একটা রিজিওনাল হাব হিসাবে গড়ে তোলা যায়, যা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, অন্যান্য দেশেরও প্রয়োজন মেটাতে পারবে, তা নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। চীন থেকে মিয়ানমার হয়ে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডর যদি চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়; তাহলে শুধু বাংলাদেশেরই লাভ হবে না, কৌশলগত দিক দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে চীনের নানাবিধ প্রভাব বিস্তারেরও সুযোগ ঘটবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বোঝাপড়া হয়েছে। সামনের দিনগুলোয় এ বিষয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে সংলাপ শুরু হবে। এ নিয়ে বিস্তারিত কর্মপদ্ধতিও ঠিক করা হচ্ছে। তবে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত বিষয়ে আলোচনা হলেও সরকারি বিবৃতিতে ১৩ সমঝোতা চুক্তির তালিকায় সুনির্দিষ্ট কারণেই তা আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি।
তারেক রহমানের চীন সফর ভারত খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, এটাই স্বাভাবিক। নিমন্ত্রণ দেওয়ার পরও ভারত সফর না করায় সে দেশের গণমাধ্যমে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। ভারতের উদ্বেগ হলো সফরকালে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত ও সামরিক সহযোগিতামূলক কী ধরনের সমঝোতা হয় সে বিষয়ে। বিশেষ করে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে চীন থেকে যে ধরনের যুদ্ধবিমান ও প্রযুক্তি ক্রয় করার কথা উঠেছে, সেদিকেই তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে যদি চীনের তৈরি সর্বাধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম সংযুক্ত হয়, তাহলে তা ভারতের জন্য সুখকর হবে না। গত বছর সংঘর্ষে চীনের তৈরি টেকনোলজি ব্যবহার করে পাকিস্তান যেভাবে ভারতকে নাজেহাল করেছে; সেই একই টেকনোলজি যদি বাংলাদেশের হাতে চলে আসে, তাহলে সেটা ভারতের জন্য যে স্বস্তির হবে না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়া চীনের প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের মাথাব্যথা তো আছেই।
ভারত মনে করে, বাংলাদেশ যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে, তা ভারতের নিরাপত্তার জন্য মোটেই ভালো হবে না। এতদিন বাংলাদেশ নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তার কারণ ছিল না। শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা ভারতের ইচ্ছার ওপর অনেকটাই নির্ভর করত। এখন দিন বদলেছে। ২০২৪-এর আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে চীনের সহযোগিতা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর একটি বৃহত্তর কৌশলগত পরিবর্তনের প্রতীক। এটি শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নয়; বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও বহুমাত্রিক করার প্রচেষ্টার অংশ। প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না হয়।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে নিজের জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগানো। যদি ঢাকা দক্ষতার সঙ্গে সেই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে, তাহলে আগামী দশকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যম শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে বলে আশা করা যায়।
একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

