দেশের আকাশে আজ কখনো শ্রাবণের মেঘের আনাগোনা, আবার কখনো মেঘের আড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি। দিনের বেলায় বৃষ্টি মেনে নিলেও শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ সবাই যেন প্রার্থনা করছে, অন্তত রাতের বেলায় বৃষ্টি না নামুক। কারণ দীর্ঘ এক মাসের ফুটবল মহোৎসবের পর আজই বিশ্বমঞ্চে নামছে চূড়ান্ত পর্দা।

নীল-সাদা আর লাল টকটকে জার্সির চিরন্তন দ্বৈরথ আজ এক মোহনায় এসে মিলেছে। আজ দিবাগত রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার হাই-ভোল্টেজ মহারণের মধ্যদিয়ে শেষ হচ্ছে বিশ্বকাপের এবারের আসর।

আরও পড়ুন

এই মাঠেই চোখের জল ফেলেছিলেন মেসি, এবার কি হবে মহাকাব্য?

গত ১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী ম্যাচ দিয়ে যে বিশ্বকাপ উৎসবের সূচনা হয়েছিল, তা আজ সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার স্মৃতিবিজড়িত বিদায়ের এক কাব্যে রূপ নিচ্ছে। বিদায়ের এই ক্ষণে সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাজার মাইল দূরের ঢাকাও যেন ফুটবল উন্মাদনার এক জীবন্ত উপাখ্যান। মধ্যরাতের এই শহর আজ যেন অর্ধেক বুয়েনস আইরেস, আর বাকিটা মাদ্রিদ।

jagonews24রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় বড়পর্দায় বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ দেখার প্রস্তুতি সম্পন্ন/ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ

বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখতে আজ রোববার দিবাগত রাতে জেগে থাকবে দেশের অগণিত ফুটবলপ্রেমী। সকাল থেকেই পাড়া-মহল্লার অলিগলি থেকে শুরু করে শহর ও গ্রাম সবখানেই চলছে ফাইনাল দেখার প্রস্তুতি। ঘড়ির কাঁটা যত মধ্যরাতের দিকে এগোচ্ছে, রাজপথের কোলাহল পেরিয়ে অলিগলি, চায়ের দোকান আর ড্রয়িংরুমগুলো যেন একেকটি মিনি স্টেডিয়ামে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায়।

ক্যাম্পাসে উন্মাদনা: আসন ধরে রাখার অলিখিত যুদ্ধ

সরেজমিনে দেখা গেছে, টিএসসির মোড় থেকে মল চত্বর, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের মাঠ কিংবা সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বারান্দা সবখানেই একই দৃশ্য। কোথাও নীল-সাদা, কোথাও লাল টকটকে জার্সিধারীদের জটলা, ফাইনাল ম্যাচে কে জিতবে তা নিয়ে খুনশুটি। কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের প্রজেক্টর ও সাউন্ড সিস্টেমের টিউনিং।

ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি স্পেন ও আর্জেন্টিনার এই মহারণকে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো রাজধানীতেই বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা। ফাইনাল দেখতে রাত জাগার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন ফুটবলপ্রেমীরা।

আরও পড়ুন

ফাইনালে আর্জেন্টিনা-স্পেন, উন্মাদনা সোশ্যাল মিডিয়ায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই আবাসিক হলগুলোর ডাইনিং ও টিভি রুমে সিট দখলের অলিখিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। টিএসসি, ভিসি চত্বর ও ডাস চত্বরে বিশালাকার প্রজেক্টর এবং এলইডি স্ক্রিন বসানোর কাজও দুপুরের মধ্যেই শেষ করেছেন আয়োজকেরা।

jagonews24গরু জবাই করে পিকনিকের প্রস্তুতিও নিয়েছেন আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের সমর্থকরা/ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী সাদমান সাকিব বলেন, ‘গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো হলে বসে দেখেছি। তবে আজ বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে ফাইনাল দেখবো। বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখার মজাই আলাদা। মাঝরাতের ম্যাচ হলেও আজ পুরো ক্যাম্পাস জেগে সকাল করবে। টিএসসির বড় পর্দায় খেলা দেখার আনন্দই অন্যরকম।’

আরও পড়ুন

সকালের ম্যাচ দেখতে রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ভিড়

এলিফ্যান্ট রোডের ব্যবসায়ী ও ফুটবলপ্রেমী কাজী কামরুজ্জামান ইমায়েত বলেন, ‘বিশ্বকাপ শুরুর আগে বড় পর্দায় খেলা দেখার জন্য তিনি ৭৫ ইঞ্চির একটি টেলিভিশন কিনেছেন। পছন্দের দল ব্রাজিল বিদায় নেওয়ায় কষ্ট পেলেও টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলো উপভোগ করেছেন। আজ রাজধানীর অদূরে আটিতে ব্যবসায়ী বন্ধুদের সঙ্গে ফাইনাল দেখার বিশেষ আয়োজন রয়েছে। সন্ধ্যা থেকে গান, আড্ডা, খাওয়াদাওয়া ও বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন থাকবে।’

একই ছাদের নিচে চিরবৈরী  দুই পক্ষ, ম্যাচ ঘিরে রসনাবিলাস

শুধু পাড়া-মহল্লা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ নয়, ফাইনালের উন্মাদনা পৌঁছে গেছে ঘরের ভেতরেও। স্মার্ট টিভি আর সাউন্ড সিস্টেমে স্টেডিয়ামের আবহ তৈরি করে নিয়েছেন ফুটবলপ্রেমীরা।

মাঝরাতের ম্যাচে ঘুম তাড়াতে ফ্লাস্কভর্তি কড়া চা-কফি, চিপস, পপকর্ন ও নানা ধরনের স্ন্যাক্সের আয়োজন করা হয়েছে। কোথাও ম্যাচ শুরুর আগেই বারবিকিউ বা কাচ্চির আসর বসছে। একই পরিবারের বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক, ছেলে স্পেনের এমন পরিবারেও চলছে মজার খুনসুটি। কেউ কেউ ম্যাচ শেষে উদযাপনের জন্য আগেভাগেই ফ্রিজে মিষ্টি ও আইসক্রিম মজুত করে রেখেছেন।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা খুনসুটি: আতাউর রহমানদের গল্প

রাজধানীর লালবাগের বাসিন্দা মধ্যবয়সী আতাউর রহমান বরাবরই ব্রাজিলের কট্টর সমর্থক। প্রিয় দল আগেই বিদায় নেওয়ায় কিছুটা মন খারাপ হলেও এখনো ব্রাজিলের জার্সি গায়েই ঘুরে বেড়ান তিনি। অন্যদিকে তার দুই সন্তান আর্জেন্টিনার অন্ধ ভক্ত। ছেলে-মেয়েরা যখনই মেসি কিংবা আর্জেন্টিনার প্রসঙ্গ তোলে, তিনি তখনই নিজের জার্সির পাঁচ তারকা দেখিয়ে যুক্তিতর্কে মেতে ওঠেন।

jagonews24সহপাঠী-বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল উন্মাদনায় মেতেছেন তরুণীরাও/ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ

আজকের ফাইনাল উপলক্ষে সন্তানরা অনলাইনে পছন্দমতো খাবার অর্ডার দেওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি সানন্দে রাজি হয়েছেন। তবে মনে মনে ভাবছেন, ‘আজই তো শেষ। আবার চার বছর পর কে কোথায়, কীভাবে থাকে!’

আরও পড়ুন

ফুটবল বিশ্বকাপ / ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত প্রবেশে কড়াকড়ি

আতাউর রহমানের মতো রাজধানীসহ দেশের অসংখ্য পরিবারে চলছে ফুটবল ঘিরে বিশ্লেষণ, তর্ক আর প্রস্তুতি। টুর্নামেন্টজুড়ে সমর্থকেরা নিজ নিজ দলের জার্সি পরে আনন্দ-উল্লাস করেছেন। জয়-পরাজয়, গোল মিস কিংবা রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে হাসি-কান্না, সবমিলিয়ে ফুটবল হয়ে উঠেছে ঘরের আবেগেরই অংশ। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের খুনসুটি কখনো কখনো হালকা মনোমালিন্যেও গড়িয়েছে।

ফেসবুকে মিমের যুদ্ধ, করপোরেটেও ফুটবল উন্মাদনা

ফুটবলকে কেন্দ্র করে বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের খুনসুটি যেন চিরন্তন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে পক্ষে-বিপক্ষে ট্রোল ও মিম তৈরির ধুম পড়েছে। কখনো কখনো একই পরিবারের দুই দলের সমর্থকদের একসঙ্গে বসে খেলা দেখাও কঠিন হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ একদিন ফুটবল বিশ্বকাপে খেলবে: আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত

ফুটবলের এই উন্মাদনা কেবল ড্রয়িংরুম বা চায়ের দোকানেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানেও এর ছোঁয়া লেগেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অংশগ্রহণে মাঠ ভাড়া করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মধ্যে প্রীতি ফুটবল ম্যাচেরও আয়োজন করেছে।

মাঠের লড়াই: লাতিন ছন্দ বনাম ইউরোপীয় গতি

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই ফাইনাল কেবল দুটি দেশের নয়; এটি দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের লড়াই।

আর্জেন্টিনার শক্তি: অভিজ্ঞতায় ভরপুর রক্ষণভাগ, সংগঠিত মাঝমাঠ এবং লাতিন ফুটবলের চিরাচরিত ড্রিবলিং, পাসিং ও যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা।

স্পেনের শক্তি: টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা একঝাঁক তরুণ ফুটবলার। উইংভিত্তিক ক্ষিপ্র আক্রমণ এবং নিখুঁত ‘টিকিটাকা’ পাসিং প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

নিরাপত্তা ও বিকল্প প্রস্তুতি

গভীর রাতে ক্যাম্পাস ও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হাজারো ফুটবলপ্রেমীর সমাগমের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে। যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ সদস্যরা তৎপর রয়েছেন।

jagonews24রাতে খেলা দেখবেন এখানে, সময় কাটাতে মাঠে নেমে পড়েছেন ফুটবলপ্রেমী তরুণরা/ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ

অন্যদিকে শ্রাবণের রাত হওয়ায় বৃষ্টির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, হঠাৎ বৃষ্টি নামলে যাতে খেলা দেখায় বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য অধিকাংশ হলের অডিটোরিয়াম ও পাড়ার ইনডোর ভেন্যুগুলো বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

অপেক্ষার প্রহর

ঘড়ির কাঁটা যত রাত ১২টার দিকে এগোচ্ছে, উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনাও তত বাড়ছে। চায়ের কাপে ঝড়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাগ্‌যুদ্ধ- সবকিছুই গিয়ে ঠেকেছে মাঠের ৯০ মিনিটের চূড়ান্ত লড়াইয়ে।

এখন কেবল রেফারির প্রথম বাঁশির অপেক্ষা। ফুটবলপ্রেমীদের এই বিনিদ্র রাত শেষ হবে কার হাসিতে, আর কার চোখ ভিজবে বিষাদে, সেই উত্তর জানার অপেক্ষায় গোটা দেশ।

এমইউ/ইএ