বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন একটি সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনীতিকেই নয়, আগামী কয়েক দশকের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকেও নির্ধারণ করতে পারে। চীনের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডর বা আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

কেউ এটিকে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে পরাশক্তির প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করছেন।

আমার মতে, এই প্রশ্নের উত্তর ‌‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ দিয়ে দেওয়া যাবে না। প্রথমে জানতে হবে, বাংলাদেশের লাভ কোথায়, ঝুঁকি কোথায় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে।

বাংলাদেশের অবস্থান অনন্য। একদিকে ভারত, অন্যদিকে মিয়ানমার, উত্তরে চীনের নিকটবর্তী অঞ্চল এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি দায়িত্বও বাড়িয়েছে।

অর্থনৈতিক করিডর যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে শুধু রাস্তা, রেলপথ বা বন্দর নির্মাণের বিষয়টি দেখা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে সীমান্ত নিরাপত্তা, কাস্টমস ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, পরিবেশ, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই উদ্যোগ কি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে?

আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ এক কোটি মানুষের কাছাকাছি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু এই সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো আসেনি। যদি চীন, ভারত, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশকে নিয়ে কোনো নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে, তাহলে সেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে বাধ্যতামূলক আলোচ্য বিষয়ে পরিণত করা উচিত। অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং মানবিক দায়িত্বকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

একই সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে। বাংলাদেশ, ভারত এবং মিয়ানমারের সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যৌথ সমন্বয়, বৈধ বাণিজ্য সম্প্রসারণ, চোরাচালান ও মানবপাচার প্রতিরোধ এবং সন্ত্রাসবিরোধী তথ্য বিনিময়কে এই উদ্যোগের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে হবে।

বাংলাদেশের উচিত হবে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিশন গঠন করা। সেখানে অর্থনীতিবিদ, সামরিক বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক আইনবিদ, পরিবেশবিদ, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী এবং সীমান্ত অঞ্চলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা। তাদের দায়িত্ব হবে প্রতিটি সম্ভাব্য লাভ ও ঝুঁকির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা এবং সেই প্রতিবেদন জনগণের সামনে প্রকাশ করা।

আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ যেন কখনো কোনো পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশে পরিণত না হয়। বাংলাদেশের কূটনীতির মূলনীতি হওয়া উচিত, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। যে প্রকল্পই আসুক, সেটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, ঋণ সক্ষমতা, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং নিরাপত্তাকে দুর্বল করতে পারবে না।

আমি মনে করি, এখন সময় এসেছে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক উদ্যোগের। যেখানে শুধু একটি অর্থনৈতিক করিডর নয়, বরং ‘বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার এবং চীনের আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরাম’ গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। সেখানে অর্থনীতি, সীমান্ত, জ্বালানি, জলবায়ু, দুর্যোগ মোকাবিলা, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং রোহিঙ্গা সংকটকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা যেতে পারে। এতে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

সবশেষে একটি কথাই বলতে চাই। কোনো করিডর, কোনো বন্দর বা কোনো বিনিয়োগ নিজেই সফলতা নয়। সফলতা তখনই, যখন তা বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নত করবে, জাতীয় নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করবে, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে বাস্তব অগ্রগতি আনবে এবং দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য, বিজ্ঞান, কূটনীতি এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে। তাহলেই এই অঞ্চলের প্রতিযোগিতা একদিন সহযোগিতায় রূপ নিতে পারে, আর বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে সংঘাতের সেতু নয়, শান্তি ও সমৃদ্ধির সংযোগস্থল।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বন্দর ও সামুদ্রিক অবকাঠামোকে ঘিরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব তৈরি হয়েছে। যদি ভবিষ্যতে চীনের প্রস্তাবিত কোনো অর্থনৈতিক করিডর বা কৌশলগত সংযোগ বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশ এই পরিবর্তনকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে।

কারণ দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, ততই বাংলাদেশ কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ইতিহাস দেখায়, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো অনেক সময় বহিরাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব বহন করে। তাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যাতে দেশের ভূখণ্ড কখনো পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে এবং জাতীয় স্বার্থ, স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সর্বাগ্রে সুরক্ষিত থাকে।

কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে থাকা রাষ্ট্রগুলো কখনও কখনও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা, প্রক্সি প্রতিযোগিতা বা বহিরাগত চাপের শিকার হতে পারে।

এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। বাংলাদেশের বন্দর ও কৌশলগত অবকাঠামোকে ঘিরে ইতোমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো অর্থনৈতিক করিডর বা কৌশলগত সংযোগ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ অন্যান্য অংশীদার দেশ তা কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটি গভীরভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

ইতিহাস দেখায়, কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে থাকা রাষ্ট্রগুলো কখনও কখনও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা, প্রক্সি প্রতিযোগিতা কিংবা বহিরাগত চাপের শিকার হতে পারে। বাংলাদেশকে তাই এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে, যেন উন্নয়নের সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ সুরক্ষা পায়।

আপনার কী মনে হয়? বাংলাদেশের কি চীনের এই করিডর প্রস্তাবে এগিয়ে যাওয়া উচিত, নাকি নিরপেক্ষ থাকা ভালো?

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]

এমআরএম