পারস্য উপসাগরে সাম্প্রতিক চরম উত্তেজনা ও ধারাবাহিক সামরিক সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধাবস্থা স্থগিত করতে এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ মেটাতে পুনরায় আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গতকাল রোববার (২৮ জুন) একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে ঘটে যাওয়া দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর হুমকির মুখে পড়া অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তিটি পুনরুজ্জীবিত করার নতুন আশা দেখা দিয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) সবকটি বিষয়ে কারিগরি আলোচনা অব্যাহত থাকবে। আপাতত উভয় পক্ষই সামরিক সংঘাত থেকে বিরত থাকবে এবং এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো অবাধে চলাচল করতে পারবে।

গত ১৭ জুনের ঐতিহাসিক সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ প্রথম এই যুদ্ধবিরতির খবর প্রকাশ করে। একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, আগামীকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) কাতারে দুই পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু হতে যাচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালিতে একটি মালবাহী জাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর থেকেই অঞ্চলটিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে ১৭ জুনের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।

রোববার ভোরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইরানকে সতর্ক করে লেখেন, ‘এমন একটা সময় আসতে পারে যখন আমরা আর ধৈর্য দেখাব না এবং সামরিকভাবে সেই কাজটি শেষ করতে বাধ্য হব যা আমরা অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করেছিলাম।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘যদি তেমনটা ঘটে, তবে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।’

ট্রাম্পের এই হুমকির পরপরই কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। আইআরজিসির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, মার্কিন বাহিনী যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় তারা এই হামলা চালিয়েছে এবং এর ফলে সমস্ত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্থগিত হয়ে যেতে পারে। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভি জানায়, আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, এই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে ‘আগামী দিনগুলোতে নরক বানিয়ে দেওয়া হবে’।

তবে মার্কিন সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সেনা হতাহত হয়নি এবং সামরিক ঘাঁটিরও বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয়নি।

রোববার বাহরাইনের আকাশসীমায় দ্বিতীয়বারের মতো সতর্ক সংকেত বা সাইরেন বাজানো হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের মুহাররাক প্রদেশে একটি ইরানি ড্রোন হামলায় একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে এতে কেউ হতাহত হননি। বাহরাইন সরকার এই ঘটনার পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জরুরি বৈঠক ডাকার আহ্বান জানিয়েছে।

অন্যদিকে, কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে।

এরই মধ্যে কাতার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিখোঁজ থাকা একটি জাহাজে সামরিক অভিযানের সময় স্প্লিন্টারের (ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো) আঘাতে আহত হয়ে তাদের একজন নাগরিক মারা গেছেন এবং আরও একজন আহত হয়েছেন। তবে কাতার সরকার এই ঘটনার সুনির্দিষ্ট স্থান বা দায়ী পক্ষের নাম উল্লেখ করেনি।

এদিকে পারস্য উপসাগরের এই উত্তেজনার মধ্যেই ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ভূগর্ভস্থ সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। গত শুক্রবার লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও রোববারের এই হামলা চালানো হলো।

বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন ও পারস্য উপসাগরের পরিস্থিতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সামগ্রিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অবিলম্বে বন্ধ হতে হবে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর শুরু হওয়া সংঘাত থামাতে এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে গত ১৭ জুন ১৪ দফার অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি সই হয়েছিল। সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের উপস্থিতিতে এক দফা আলোচনাও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। তবে মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় আবারও এই যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল।

মঙ্গলবারের কাতার বৈঠক এখন এই অঞ্চলের শান্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।