উগান্ডার শীর্ষস্থানীয় তিনটি সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল মুহুজি কাইনেরুগাবা। তিনি স্বাধীন গণমাধ্যমে বিশ্বাসী নন উল্লেখ করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে জানা গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে সেনাপ্রধান লিখেছেন, ‘আমি স্বাধীন গণমাধ্যমে বিশ্বাস করি না! গণমাধ্যমকে অবশ্যই বিপ্লবের ক্যাডারদের নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে হবে।’

সেনাপ্রধান মুহুজি দেশটির প্রেসিডেন্ট ইওওয়েরি মুসেভেনির ছেলে। তিনি দেশটির সব টেলিভিশন চ্যানেল, সংবাদপত্র ও রেডিও স্টেশন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এই কঠোর পদক্ষেপের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।

এদিকে দৈনিক ডেইলি মনিটর জানিয়েছে, রাজধানী কাম্পালায় তাদের প্রধান কার্যালয়ের বাইরে সশস্ত্র সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে এনটিভি ও স্পার্ক টিভির সম্প্রচারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এই গণমাধ্যমগুলো পূর্ব আফ্রিকার অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান নেশন মিডিয়া গ্রুপের মালিকানাধীন।

বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, জেনারেল কাইনেরুগাবা তাঁর বাবার নেতৃত্বাধীন কঠোর দমনমূলক শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মুখ। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর পরিবারের সমর্থকেরা বলছেন, তাঁদের শাসনেই উগান্ডায় স্থিতিশীলতা এসেছে এবং দেশের অর্থনীতির উন্নতি হয়েছে।

৮১ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট মুসেভেনি একজন সাবেক বিদ্রোহী নেতা। প্রায় ৪০ বছর আগে তিনি ক্ষমতায় আসেন। গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনে তিনি রেকর্ড সপ্তম মেয়াদে জয়ী হন। দীর্ঘদিন ধরেই জোর গুঞ্জন রয়েছে, তিনি ভবিষ্যতে নিজের ছেলেকেই উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।

জেনারেল কাইনেরুগাবা এক্স-এ আরও জানান, তাঁর ‘মহান’ পিতা তাঁকে ‘যেকোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা’ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার অনুমতি ছাড়া এনটিভি ও ডেইলি মনিটর আর খুলবে না।’

জেনারেল আরও লেখেন, ‘এখন থেকে উগান্ডার সব গণমাধ্যম নিয়ম মেনে চলবে!’

ডেইলি মনিটর এক্স-এ এক পোস্টে জানিয়েছে, রোববার ভোররাতে অভিযান চালিয়ে পত্রিকাটি ও তাদের সহযোগী গণমাধ্যমগুলো বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

অভিযানের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ না করলেও পত্রিকাটি তাদের ওয়েবসাইটে এই খবর প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কর্মীরা জানিয়েছেন যে কাউকে কার্যালয়ে প্রবেশ বা বের হতে দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে এনটিভি উগান্ডা ও স্পার্ক টিভির দর্শকেরা টিভি পর্দায় শুধু ‘ভিডিও আনঅ্যাভেইলেবল’ বার্তা দেখতে পাচ্ছেন।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১৩ সালেও ডেইলি মনিটরে অভিযান চালিয়েছিল পুলিশ। সে সময় ‘মুহুজি প্রজেক্ট’ নামে একটি উত্তরাধিকার পরিকল্পনায় সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে একটি চিঠি প্রকাশ করেছিল পত্রিকাটি। আর ২০০৭ সালে সরকারের সমালোচনামূলক সংবাদ প্রচারের অভিযোগে এনটিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘বছরের পর বছর ধরে মুসেভেনি বারবার ডেইলি মনিটরের সমালোচনা করেছেন। একপর্যায়ে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার কারণে তিনি পত্রিকাটিকে “শত্রু ও অশুভ সংবাদপত্র” বলেও আখ্যা দেন।’

উগান্ডার ন্যাশনাল ব্রডকাস্টার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, গণমাধ্যম বন্ধের এই সিদ্ধান্ত সংবিধানের লঙ্ঘন। এ বিষয়ে তারা সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে।

বর্তমানে নির্বাসনে থাকা উগান্ডার পরাজিত বিরোধীদলীয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ববি ওয়াইন বলেছেন, জেনারেল কাইনেরুগাবা উগান্ডার অবশিষ্ট স্বাধীন কণ্ঠস্বরগুলোকে স্তব্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছেন।

এক্স-এ তিনি বলেন, ‘এটিই এখন আমাদের নিষ্ঠুর বাস্তবতা। উন্মুক্ত সামরিক শাসনের অধীনে থাকা একটি দেশ, যেখানে আইনের জায়গা নিয়েছে ভয় আর জবাবদিহির জায়গা নিয়েছে বলপ্রয়োগ।’

গত জানুয়ারির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সময় জেনারেল কাইনেরুগাবা এক্সে এক পোস্টে ববি ওয়াইনের অণ্ডকোষ কেটে ফেলার হুমকি দিয়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিলেন। অবশ্য পরে পোস্টটি মুছে ফেলা হয়।

ভোটের আগে বিরোধী দলের সমাবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনী অনেক সময় গুলিও চালিয়েছিল। জাতিসংঘ এ নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেছিল, ‘রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন–পীড়ন ও ভীতি প্রদর্শনের পরিবেশে’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে নির্বাচন কর্মকর্তাদের দাবি ছিল, ভোট অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে।