একসময় বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের পরিচয় ছিল দুর্ভিক্ষ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রায়ই তুলে ধরা হতো সংকটের প্রতীক হিসেবে। কিন্তু গত পাঁচ দশকে সেই চিত্রে এসেছে আমূল পরিবর্তন। জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে বাংলাদেশ, বিশ্ব বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ, দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি এবং মানব উন্নয়নের নানা সূচকে ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জনকারী রাষ্ট্র হিসেবে নতুন পরিচয় তৈরি করেছে।
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার প্রশংসা করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। এর প্রায় ৮০ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। কৃষি উৎপাদনেও দেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। স্বাধীনতার সময় যেখানে খাদ্যঘাটতি ছিল নিয়মিত ঘটনা, সেখানে বর্তমানে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। গত দুই দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সড়ক যোগাযোগ, সেতু নির্মাণ, ডিজিটাল সেবা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে।
কিন্তু একটি বাস্তবতা আমাদের স্বীকার করতেই হবে। অর্থনৈতিক সাফল্য কোনো দেশের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড তৈরি করে না। উন্নয়ন একটি দেশের সক্ষমতার পরিচয় দেয়, আর ব্র্যান্ড একটি দেশের গ্রহণযোগ্যতা, আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক প্রভাবের পরিচয় বহন করে। বিশ্বের মানুষ একটি দেশকে শুধু তার জিডিপি দিয়ে মনে রাখে না। তারা মনে রাখে সেই দেশের সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি, পর্যটন, শিক্ষা, উদ্ভাবন এবং মানুষের জীবনধারাকে।
অর্থনৈতিক সাফল্য একটি দেশের ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু সেই ভিত্তির ওপর সম্মান, আস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবের যে স্থাপনা নির্মিত হয়, তার নামই ব্র্যান্ড। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানের গল্প বিশ্ব ইতোমধ্যে শুনেছে। এখন সময় বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের নতুন গল্প তুলে ধরার। সেই গল্পের মূল শক্তি হতে পারে সফট পাওয়ার, উদ্ভাবন, পর্যটন এবং সৃজনশীল মানবসম্পদ। এই চার শক্তিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠতে পারে আগামী দিনের শক্তিশালী ব্র্যান্ড বাংলাদেশ।
এই কারণেই দেখা যায়, অর্থনীতিতে বাংলাদেশের চেয়ে ছোট অনেক দেশ বিশ্বে অনেক বেশি পরিচিত। নিউজিল্যান্ডকে মানুষ চেনে তার প্রকৃতি ও পর্যটনের জন্য। ফিনল্যান্ডকে চেনে শিক্ষা ও উদ্ভাবনের জন্য। দক্ষিণ কোরিয়াকে চেনে কে-পপ, প্রযুক্তি এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির জন্য। জাপানকে চেনে প্রযুক্তি, শৃঙ্খলা এবং অ্যানিমের জন্য। সুইজারল্যান্ডকে চেনে নির্ভরযোগ্যতা, ব্যাংকিং ও ঘড়ির জন্য। লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে ফুটবল দিয়ে। এসব দেশের অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের বৈশ্বিক পরিচয় গড়ে উঠেছে পরিকল্পিত ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে।
একটি দেশের এই ইতিবাচক পরিচয় গড়ে ওঠে সফট পাওয়ারের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রখ্যাত গবেষক জোসেফ এস. নাই ১৯৯০ সালে সফট পাওয়ার ধারণাটি সামনে আনেন। তাঁর ভাষায়, সফট পাওয়ার হলো এমন এক ক্ষমতা, যার মাধ্যমে কোনো দেশ বলপ্রয়োগ বা অর্থনৈতিক চাপ ছাড়াই অন্যদের আকৃষ্ট করতে পারে। সংস্কৃতি, শিক্ষা, ভাষা, মূল্যবোধ, বিজ্ঞান, ক্রীড়া, গণমাধ্যম, চলচ্চিত্র এবং সৃজনশীল শিল্প এই শক্তির প্রধান উৎস।
বর্তমান বিশ্বে সফট পাওয়ারের গুরুত্ব কতটা বেড়েছে, তার সবচেয়ে সফল উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৯০-এর দশকে দেশটির সরকার সংস্কৃতি শিল্পকে অর্থনীতির কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করে। ফলাফল আজ সবার সামনে। কে-পপ ব্যান্ড, কোরিয়ান নাটক, চলচ্চিত্র, প্রসাধনী, খাবার এবং ফ্যাশন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে জনপ্রিয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, কোরিয়ান ওয়েভ বা হাল্লিউ শুধু সংস্কৃতির প্রসার ঘটায়নি, বরং পর্যটন, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিকস এবং খাদ্যপণ্যের রপ্তানিও কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। একটি গান, একটি নাটক কিংবা একটি চলচ্চিত্র কীভাবে একটি দেশের অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করতে পারে, দক্ষিণ কোরিয়া তার বাস্তব উদাহরণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সফট পাওয়ারের সম্ভাবনা কম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা অনন্য। বাংলা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ভাষা। বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটির বেশি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। ভাষার জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল। সেই ইতিহাসের স্বীকৃতি হিসেবে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে, যা বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পালিত হয়। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বৈশ্বিক পরিচয়গুলোর একটি।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও অসাধারণ সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য, কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা, লালনের দর্শন, বাউলসংগীত, নকশিকাঁথা, জামদানি, মসলিন, লোকসংগীত, বৈশাখ উদযাপন এবং মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলাদেশের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। জামদানি, বাউল গান, মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ বাংলাদেশের একাধিক ঐতিহ্য ইউনেস্কোর মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। কিন্তু এসব সম্পদকে বিশ্ববাজারে সাংস্কৃতিক পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের উদ্যোগ এখনো সীমিত। আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংগীতের উপস্থিতি খুবই কম। বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোতেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
একবিংশ শতাব্দীতে উদ্ভাবনী সক্ষমতা একটি দেশের ব্র্যান্ড পরিচয়ের অন্যতম প্রধান সূচক হয়ে উঠেছে। আজ বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত শহরগুলোর মধ্যে সিলিকন ভ্যালি কিংবা বেঙ্গালুরুর নাম আসে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের কারণে। একটি সফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা স্টার্টআপ শুধু ব্যবসা করে না, এটি একটি দেশের সক্ষমতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশেও গত এক দশকে স্টার্টআপ খাতের দ্রুত বিকাশ ঘটেছে। তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, শিক্ষা প্রযুক্তি, কৃষি প্রযুক্তি এবং ই-কমার্সে শত শত নতুন উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে এক হাজারেরও বেশি সক্রিয় স্টার্টআপ রয়েছে বলে বিভিন্ন শিল্পবিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে লাখো তরুণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় জিডিপির এক শতাংশেরও অনেক নিচে। উন্নত অর্থনীতিতে এই হার দুই থেকে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে উঠছে না। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে না পারলে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা কঠিন হবে।
পর্যটনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা অসীম। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর এক বিলিয়নের বেশি মানুষ আন্তর্জাতিক ভ্রমণ করেন এবং এই খাত বৈশ্বিক জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশে অবদান রাখে। অনেক দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎসই পর্যটন। অথচ বাংলাদেশের পর্যটন খাত এখনো সেই সম্ভাবনা অনুযায়ী বিকশিত হয়নি।
বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, ইউনেস্কো স্বীকৃত পাহাড়পুর মহাবিহার, ষাটগম্বুজ মসজিদ, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সংস্কৃতি, সিলেটের চা-বাগান, টাঙ্গুয়ার হাওর, রাতারগুল জলাবন, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী, কুয়াকাটা এবং নদীমাতৃক বাংলার গ্রামীণ জীবন মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি অনন্য পর্যটন গন্তব্য হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। কারণ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকলেই হয় না, প্রয়োজন আধুনিক অবকাঠামো, নিরাপত্তা, উন্নত সেবা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আন্তর্জাতিক বিপণন।
আজকের পর্যটক শুধু দর্শনীয় স্থান দেখতে চান না। তাঁরা একটি দেশের জীবনধারা, সংস্কৃতি, খাবার, মানুষের আতিথেয়তা এবং অভিজ্ঞতা জানতে চান। এই জায়গাতেই বাংলাদেশ অনেক কিছু দিতে পারে। দেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার, নদীকেন্দ্রিক জীবন, লোকসংস্কৃতি, উৎসব এবং অতিথিপরায়ণতা আন্তর্জাতিক পর্যটনের জন্য বড় সম্পদ হতে পারে।
জাতীয় ব্র্যান্ড গঠনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের প্রায় দেড় কোটির বেশি বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। তাঁরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ব্যবসা ও সম্ভাবনারও প্রতিনিধিত্ব করেন। পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক কূটনীতি এবং প্রবাসী নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানো গেলে ব্র্যান্ড বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়তে পারে।
এক্ষেত্রে সরকার, বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পোদ্যোক্তা, গণমাধ্যম এবং সংস্কৃতিকর্মীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু বিদেশে বিজ্ঞাপন প্রচার করে কোনো দেশের ব্র্যান্ড গড়ে ওঠে না। বাস্তব উন্নয়ন, সুশাসন, নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ, উদ্ভাবনী অর্থনীতি, মানসম্পন্ন শিক্ষা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং ইতিবাচক আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা মিলিয়েই একটি দেশের বিশ্বাসযোগ্য পরিচয় তৈরি হয়।
বাংলাদেশ উন্নয়নের বহু সূচকে ইতোমধ্যে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই উন্নয়নকে একটি শক্তিশালী জাতীয় ব্র্যান্ডে রূপ দেওয়া। বিশ্ব যেন বাংলাদেশকে শুধু তৈরি পোশাকের দেশ হিসেবে না চেনে, শুধু জনসংখ্যার দেশ হিসেবেও না দেখে। বরং এমন একটি দেশ হিসেবে চিনুক, যে দেশ ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, সংস্কৃতিকে ধারণ করে, প্রযুক্তিতে এগিয়ে যেতে চায়, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা ধারণ করে এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের গল্প বলতে জানে।
অর্থনৈতিক সাফল্য একটি দেশের ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু সেই ভিত্তির ওপর সম্মান, আস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবের যে স্থাপনা নির্মিত হয়, তার নামই ব্র্যান্ড। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানের গল্প বিশ্ব ইতোমধ্যে শুনেছে। এখন সময় বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের নতুন গল্প তুলে ধরার। সেই গল্পের মূল শক্তি হতে পারে সফট পাওয়ার, উদ্ভাবন, পর্যটন এবং সৃজনশীল মানবসম্পদ। এই চার শক্তিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠতে পারে আগামী দিনের শক্তিশালী ব্র্যান্ড বাংলাদেশ।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
এইচআর/এএসএম








