ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় যদি শুধু নির্বাচনী অঙ্ক, সুইং বা প্রশাসনিক কৌশলের অর্থাৎ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর), ইলেকশন কমিশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে বাস্তব রাজনৈতিক সত্যকে আড়াল করা হবে। গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এই ফলাফল মূলত একটি শ্রেণিগত পুনর্বিন্যাসের ফল, যেখানে শাসকশ্রেণির ভেতরকার দ্বন্দ্ব নতুন রূপে এসেছে এবং নিপীড়িত শ্রেণির অসন্তোষকে উগ্র ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদী শক্তি ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। মার্ক্সবাদ আমাদের শেখায় যে রাষ্ট্র কখনো নিরপেক্ষ নয়; এটি সর্বদা শাসকশ্রেণির আধিপত্য বজায় রাখার একটি যন্ত্র। এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং তাদের শ্রেণি চরিত্রের স্বাভাবিক পরিণতি ঘটেছে।
তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে নিজ দলকে গরিবের দল হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে তারা ছিল একধরনের মধ্যস্বত্বভোগী শক্তি, যারা পুঁজিবাদীব্যবস্থার মধ্যে থেকে কিছু কল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে শাসন বজায় রেখেছিল। এই মডেল প্রথম দিকে কার্যকর হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। গ্রামে জমির প্রশ্ন, শহরে কর্মসংস্থানের প্রশ্ন, শিক্ষায় দুর্নীতি—সব মিলিয়ে যে ক্ষোভ জনগণের মধ্যে জমেছিল, তা কোনো প্রকৃত বামপন্থী শক্তির অভাবে উগ্র ডানপন্থী ফ্যাসিবাদী শক্তির দিকে চলে গেছে। এখানে মূল প্রশ্ন হলো, কেন সেই ক্ষোভ বামপন্থীদের দিকে গেল না? উত্তর হলো, বামপন্থীরা নিজেরাই শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতি থেকে সরে এসে সংসদীয় আরামদায়ক অবস্থানে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
শ্রেণিসংগ্রাম কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়; এটি বাস্তব লড়াইয়ের রণনীতি। কিন্তু বর্তমান বাম রাজনীতি সেই লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন, শ্রমিক আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন, কৃষক আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন। এই শূন্যতায় ধর্মীয় মেরুকরণ সহজেই জায়গা করে নিয়েছে। বিজেপি এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে, তারা নতুন কিছু তৈরি করেনি, শুধু বিদ্যমান সমাজ অসন্তোষকে নিজেদের দিকে টেনে আনতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ, শ্রেণিসংগ্রামের জায়গায় ‘ধর্ম পরিচয়ের সংঘর্ষ’ বসিয়ে দিয়েছে। তৃণমূলসহ অন্যান্য দক্ষিণপন্থী দল বিষয়টি নরম হিন্দুত্বের মধ্য দিয়ে সমাধান করতে চেয়েছে। সংসদীয় বামপন্থীরা এই বিষয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক মডেল গড়ে তুলতে পারেনি।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ ছিল, তা ছিল বাস্তব। দাদাগিরি, প্রশাসনিক তোলাবাজি, দুর্নীতি—এসব মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। কিন্তু এই ক্ষোভকে সংগঠিত করে একটি বিপ্লবী দিশা দেওয়ার কাজ বামপন্থীরা করে উঠতে পারেনি। বরং সংসদীয় বামপন্থীরা অনেক ক্ষেত্রে তৃণমূল বিরোধিতাকে এমনভাবে সামনে এনেছে, যা পরোক্ষে বিজেপির পক্ষে গেছে। এই রাজনৈতিক ভুল শুধু কৌশলগত নয়, এটি আদর্শগত দেউলিয়াপনার লক্ষণ। যখন প্রধান শত্রু কে, সেই প্রশ্নে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তখন রাজনীতি অনিবার্যভাবেই ভুল পথে পরিচালিত হয়।
একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো হলো, ভোট-পরবর্তী সময়ে সংসদীয় বামেরা বিশেষত সিপিএম যারা রাষ্ট্রীয় ভোট লুট এবং ফ্যাসিজমকে আড়াল করে শুধু আক্রমণ করে চলেছে তৃণমূলকে। হাবেভাবে তারাও এই ফ্যাসিস্ট বিজয়ের বড় শরিক। এদের একটা বড় অংশ মূলত ভদ্রলোক হিন্দু, উচ্চ ও মধ্যবিত্ত, যারা উল্লাস করছে বিজেপির সঙ্গে তাল মিলিয়ে। এরাই বিজেপির সঙ্গে একই ভাষায় প্রচার চালিয়েছে স্বচ্ছ এসআইআর দিতে হবে। কারণ, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘুষপেটিয়াদের (অনুপ্রবেশকারী) ভোটে জেতে ইত্যাদি। এদের ভেতরে কী ভয়ংকর মুসলিম বিদ্বেষ রয়েছে, তার প্রতিফলন প্রকট চেহারায় আমরা দেখতে পেলাম বিজেপির এবারের বাংলা দখলে। এদের নেতৃত্ব সুচারুভাবে মুসলিম ঐক্য ভেঙে বিজেপিকে সাহায্য করতে এবং নিজেদের হিন্দু ভোট বিজেপিতে পাঠাতে একেবারে নিখুঁত কারিগরের ভূমিকা পালন করেছে।
এই নির্বাচনে তৃণমূলের যে ৭ শতাংশ ভোট সুইং হয়ে বিজেপির দিকে গেছে, সেটি কোনো একক কারণে হয়নি। এটি একটি সমষ্টিগত প্রক্রিয়া, যেখানে অর্থনৈতিক, সামাজিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক হতাশা একসঙ্গে কাজ করেছে। গ্রামীণ দরিদ্র, যারা আগে তৃণমূলের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা বিকল্প খুঁজেছে। শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত, যারা চাকরি ও শিক্ষার সুযোগ হারিয়েছে, তারা ক্ষুব্ধ হয়েছে। এই দুই শ্রেণির ক্ষোভ একসঙ্গে মিলেছে। কিন্তু তার রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে উগ্র ডানপন্থা ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে। কারণ, বামপন্থীরা সেই ক্ষোভকে সংগঠিত করার মতো শক্তি দেখাতে পারেনি।
ধর্মীয় মেরুকরণ এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু এটিকে মূল কারণ ভাবলে ভুল হবে। এটি একটি আচ্ছাদন, যার আড়ালে প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে গেছে। যখন একজন বেকার যুবক কাজ পাচ্ছে না, তখন তাকে যদি বলা হয় তার সমস্যার কারণ অন্য ধর্মের মানুষ, হতাশায় তখন সে সহজেই কথার ফাঁদে পড়ে যায়। অসহায় অবস্থায় এক অদৃশ্য শক্তির কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করে। কারণ, তার সামনে কোনো বিকল্প ব্যাখ্যা নেই। বামপন্থীদের কাজ ছিল সেই বিকল্প ব্যাখ্যা দেওয়া; পথ দেখানো, যে তার শত্রু অন্য ধর্মের মানুষ নয়, বরং সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা তাকে বেকার করে রেখেছে। কিন্তু সেই কাজটি করা হয়নি।
যদি বামপন্থীরা সত্যিই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চায়, তাহলে শুধু নৈতিক ও তাত্ত্বিক উচ্চতা দেখিয়ে রাজনীতি করা যাবে না; পাশাপাশি কার্যকরী শক্তি গড়ে তুলতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, বামপন্থীদের কী করা উচিত? বামপন্থীদের সামনে এখন কোনো মধ্যপন্থা নেই। হয় তাদের আবার শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতিতে ফিরতে হবে, নয়তো ইতিহাসের প্রান্তে সরে যেতে হবে।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন একটি তীব্র, নির্ভীক এবং আপসহীন বামপন্থী রাজনীতি, যেখানে শ্রেণিসংগ্রাম শুধু স্লোগান নয়, বাস্তব কর্মসূচি হয়ে উঠবে। প্রতিদিন মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। রাস্তায়, কারখানায়, মাঠে বাস্তব রূপ নেবে। মানুষের সমস্যার মূল কারণ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বোধগম্য করে তুলতে হবে। না হলে এই পরাজয় কেবল তৃণমূলের থাকবে না; এটি পুরো প্রগতিশীল বাম রাজনীতির পরাজয়ে পরিণত হবে। আর সেই পরাজয় পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ জনগণের জীবনকেও তছনছ করে দেবে!
আজ হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদী শক্তি যখন বাংলাকে দখল করেছে, তখন এই কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ফ্যাসিবাদকেই প্রধান বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে এবং সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তিকে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জন্য সমবেত হতে হবে।








