রাষ্ট্রের শক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীকগুলোর একটি হলো পুলিশ। একজন নাগরিক যখন বিপদে পড়েন, কোনো অপরাধের শিকার হন কিংবা জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তখন প্রথম যে প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকান, সেটি পুলিশ। তাই পুলিশের পরিচয় কেবল একটি ইউনিফর্ম নয়; এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও জনআস্থার প্রতিচ্ছবি। সেই কারণে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের খবর নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরও বড় প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তন কি শুধু বাহ্যিক থাকবে, নাকি আচরণ, সংস্কৃতি ও মানসিকতায়ও প্রতিফলিত হবে?

Police শব্দটি ইংরেজি ভাষায় শুধু একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জননিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং নাগরিক সেবার একটি বিস্তৃত দর্শন। শব্দটির উৎস গ্রিক polis (শহর বা রাষ্ট্র) এবং politeia (রাষ্ট্র পরিচালনা বা নাগরিক শাসন) থেকে, যা পরে লাতিন politia এবং ফরাসি police হয়ে ইংরেজিতে Police রূপে এসেছে। আধুনিক অর্থে পুলিশ বলতে এমন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বোঝায়, যার প্রধান দায়িত্ব আইন প্রয়োগ, অপরাধ প্রতিরোধ, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অনেকেই POLICE শব্দটির অক্ষর ধরে Polite, Obedient, Loyal, Intelligent, Courageous, Efficient—এ ধরনের ব্যাখ্যা দেন। যদিও এটি কোনো আনুষ্ঠানিক বা অভিধানস্বীকৃত সংজ্ঞা নয়, তবু পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাশিত গুণাবলি বোঝাতে এটি জনপ্রিয় একটি ব্যাখ্যা। প্রকৃত অর্থে একজন পুলিশ সদস্যের পরিচয় তাঁর ইউনিফর্মে নয়; বরং পেশাদারত্ব, সততা, মানবিকতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ আচরণেই নিহিত।

১ জুলাই থেকে বাংলাদেশ পুলিশের নতুন পোশাক আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। জেলা পুলিশ ও অধিকাংশ ইউনিটের সদস্যরা এখন গাঢ় নীল শার্ট ও খাকি রঙের প্যান্ট পরছেন। মহানগর পুলিশের শার্টের রং হালকা জলপাই। পুলিশ সদর দপ্তরের প্রজ্ঞাপনে শুধু শার্ট-প্যান্ট নয়, জ্যাকেট, কার্ডিগান, নারী সদস্যদের পোশাক, মাথার আবরণ, এমনকি গ্রীষ্ম ও শীতকালীন পোশাকের ধরন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব সদস্য এই নতুন ইউনিফর্ম পাবেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ইতিহাস ইউনিফর্মের রং মনে রাখে না; মনে রাখে ইউনিফর্ম পরা মানুষের চরিত্র। জনগণও পুলিশের পোশাকের গাঢ় নীল, জলপাই বা খাকি রং নয়, তাদের ব্যবহারের উজ্জ্বলতাই স্মরণে রাখবে। তাই আজকের সবচেয়ে জরুরি আহ্বান একটাই—শুধু পুলিশের পোশাক নয়, আচরণেও পরিবর্তন আসুক। কারণ একটি নতুন ইউনিফর্ম রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বদলাতে পারে না; কিন্তু একটি মানবিক, সৎ ও জনগণমুখী পুলিশ বাহিনী পুরো জাতির আত্মবিশ্বাস বদলে দিতে পারে।

এই পরিবর্তনের পেছনে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়। সরকারের পরিবর্তনের পর পুলিশ সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। সেই দাবির অংশ হিসেবেই প্রথমে লোহা-ধূসর রঙের পোশাক চালু করা হয়েছিল। কিন্তু সেই পোশাক মাঠপর্যায়ের সদস্যদের কাছেও খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপহাস, নানামুখী সমালোচনা এবং ব্যবহারিক অসন্তুষ্টির কারণে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। পোশাক কি পুলিশের ভাবমূর্তি বদলে দিতে পারে? পোশাকের গুরুত্ব অবশ্যই আছে। ইউনিফর্ম শৃঙ্খলা, পরিচয় এবং পেশাগত মর্যাদার প্রতীক। একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও কার্যকর ইউনিফর্ম সদস্যদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, জনগণের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশই সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক পরিবর্তন করেছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনো দেশেই শুধু পোশাক বদলে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসেনি।

আস্থা তৈরি হয় আচরণের মাধ্যমে। একজন পুলিশ সদস্য যদি থানায় অভিযোগ করতে যাওয়া একজন সাধারণ মানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বলেন, আইনি সহায়তা দিতে আন্তরিক হন, অযথা হয়রানি না করেন, ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকেন এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে আইনের প্রতি অনুগত থাকেন, তাহলে তাঁর ইউনিফর্মের রং কী—সেটি খুব দ্রুতই গৌণ হয়ে যায়। আবার বিপরীতভাবে, পোশাক যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, যদি মানুষের মনে ভয়, অবিশ্বাস কিংবা অপমানের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে, তাহলে সেই ইউনিফর্ম কখনোই সম্মানের প্রতীক হতে পারে না।

বাংলাদেশে পুলিশের প্রতি মানুষের মনোভাব দীর্ঘদিন ধরে দ্বৈত। একদিকে অসংখ্য পুলিশ সদস্য সাহসিকতার সঙ্গে সন্ত্রাস দমন, দুর্যোগ মোকাবিলা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধার কিংবা অপরাধ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। আবার অন্যদিকে ঘুস, হয়রানি, অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাব, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই দুই বাস্তবতা একই সঙ্গে বিদ্যমান।

এই সংকট কেবল বাংলাদেশের নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশও বিভিন্ন সময়ে পুলিশের প্রতি জনআস্থা হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু তারা বুঝেছে, সংস্কার মানে শুধু প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়; সংস্কার মানে প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি বদলে দেওয়া।

যুক্তরাজ্যে পুলিশিংয়ের মূল দর্শন হলো ‘Policing by Consent’—অর্থাৎ জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে পুলিশি কার্যক্রম পরিচালনা। সেখানে পুলিশের ক্ষমতার উৎস কেবল আইন নয়, জনগণের আস্থা। জাপানে ছোট ছোট কমিউনিটি পুলিশ বক্স বা কোবান ব্যবস্থার মাধ্যমে পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে প্রতিদিনের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ফলে পুলিশকে সেখানে ভয়ের প্রতীক নয়, সহযোগী হিসেবে দেখা হয়। কানাডা, নরওয়ে কিংবা নিউজিল্যান্ডে পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত মানবাধিকার, যোগাযোগ দক্ষতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এসব দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, আধুনিক পুলিশিংয়ের মূল শক্তি অস্ত্র নয়, বিশ্বাস। বাংলাদেশেও সেই পথেই হাঁটতে হবে।

পুলিশ সংস্কারের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত আচরণগত পরিবর্তনকে। থানায় প্রবেশ করা একজন সাধারণ নাগরিক যেন নিজেকে অপরাধী মনে না করেন। অভিযোগ গ্রহণে অযথা টালবাহানা, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একজন পুলিশ সদস্যের ভাষা, মুখের অভিব্যক্তি, ধৈর্য এবং সহমর্মিতা অনেক সময় একটি মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে মানুষের মনে।

একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের কাজের পরিবেশও বিবেচনায় নিতে হবে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, মানসিক চাপ, সীমিত আবাসন সুবিধা এবং পরিবার থেকে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা একজন সদস্যের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আচরণ পরিবর্তনের দাবি তোলার পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে পুলিশ সদস্যদের মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। একটি ক্লান্ত, অবসাদগ্রস্ত ও অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত বাহিনীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক পুলিশিং এখন সময়ের দাবি। থানার সেবাগুলো আরও ডিজিটাল করা, অভিযোগ গ্রহণের স্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরি, বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরার ব্যবহার, সিসিটিভিনির্ভর তদারকি, স্বাধীন অভিযোগ তদন্ত ব্যবস্থা এবং নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। বিশ্বের বহু দেশে এই ধরনের ব্যবস্থার ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ কোনো সরকার, দল বা ব্যক্তির বাহিনী নয়; তারা সংবিধান ও আইনের রক্ষক। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কোনো সুস্থ রাষ্ট্রের লক্ষণ নয়। একটি পেশাদার পুলিশ বাহিনী সেই বাহিনীই, যারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে আইনের প্রতি সমানভাবে অনুগত থাকে।

পুলিশের নতুন ইউনিফর্ম নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। কেউ বলছেন এটি আগের চেয়ে আকর্ষণীয়, কেউ বলছেন বাংলাদেশের আবহাওয়া ও বাস্তবতার সঙ্গে বেশি মানানসই। এসব আলোচনা স্বাভাবিক। কিন্তু এই আলোচনার আড়ালে যেন মূল বিষয়টি হারিয়ে না যায়।

মানুষ পুলিশের পোশাক দেখে নয়, আচরণ দেখে বিচার করে। থানায় গিয়ে একজন বৃদ্ধ যদি সম্মান পান, একজন নারী যদি নিরাপদ বোধ করেন, একজন দরিদ্র মানুষ যদি ঘুস ছাড়াই ন্যায়বিচারের প্রাথমিক সহায়তা পান, একজন সাংবাদিক যদি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অযথা বাধার মুখে না পড়েন, একজন রাজনৈতিক ভিন্নমতের নাগরিক যদি সমান আইনি সুরক্ষা পান—তবেই পুলিশের নতুন পোশাক সত্যিকার অর্থে নতুন অর্থ পাবে।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে সংস্কারের আলোচনা চলছে। এই সময়ে পুলিশের ইউনিফর্ম পরিবর্তনকে কেবল রঙের পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি হতে পারে একটি নতুন সূচনা—যদি সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পেশাদারত্ব, মানবিকতা, জবাবদিহি ও জনসেবা।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাস ইউনিফর্মের রং মনে রাখে না; মনে রাখে ইউনিফর্ম পরা মানুষের চরিত্র। জনগণও পুলিশের পোশাকের গাঢ় নীল, জলপাই বা খাকি রং নয়, তাদের ব্যবহারের উজ্জ্বলতাই স্মরণে রাখবে। তাই আজকের সবচেয়ে জরুরি আহ্বান একটাই—শুধু পুলিশের পোশাক নয়, আচরণেও পরিবর্তন আসুক। কারণ একটি নতুন ইউনিফর্ম রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বদলাতে পারে না; কিন্তু একটি মানবিক, সৎ ও জনগণমুখী পুলিশ বাহিনী পুরো জাতির আত্মবিশ্বাস বদলে দিতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/এএসএম