আমরা যখন বহুমাত্রিক কূটনীতি এবং ‘লুক ইস্ট পলিসির’ (যার মূল লক্ষ্য পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করা) কথা বলি, তখন বিশ্ব অর্থনীতির দুই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ‘আসিয়ান’ ও ‘ব্রিকস’-এর বাইরে বাংলাদেশের অবস্থান একধরনের কৌশলগত শূন্যতাকেই স্পষ্ট করে।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা আর কোনো একক পরাশক্তির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় না। ওয়াশিংটন কিংবা ব্রাসেলসের পাশাপাশি আজ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সমান গুরুত্ব নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে বেইজিং, নয়াদিল্লি, জাকার্তা ও প্রিটোরিয়ার মতো শক্তিকেন্দ্র। এই বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় দুটি অর্থনৈতিক জোট হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘আসিয়ান’ এবং উদীয়মান অর্থনীতির বৈশ্বিক জোট ‘ব্রিকস’। ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে বাংলাদেশ এই দুই শক্তিশালী বলয়ের মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকলেও এখনো কোনোটিরই পূর্ণাঙ্গ সদস্য হতে পারেনি। অথচ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য এই দুই জোটে সম্পৃক্ত হওয়া আর বিলাসিতা নয়; বরং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। কিন্তু ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বিরোধের কারণে সার্ক কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, আসিয়ানের কঠোর সদস্যপদ নীতি এবং মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের জটিলতা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকে দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত করেছে। একইভাবে, ২০২৩ সালের জোহানেসবার্গ শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিকস সম্প্রসারণের সময় ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ও সদস্যদেশগুলোর ঐকমত্যের অভাবে বাংলাদেশ পূর্ণ সদস্যপদ না পেলেও নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) অংশীদার হিসেবে যুক্ত হতে সক্ষম হয়েছে। ফলে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ জোটের বাইরে বাংলাদেশের অবস্থান একধরনের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে, যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা জরুরি।

এই প্রয়োজনীয়তার মূল কারণ লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের আসন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতায়। এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপসহ বিভিন্ন উন্নত বাজারে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধার অবসান ঘটবে। এ পরিস্থিতিতে প্রায় ৭০ কোটির বেশি মানুষের আসিয়ান বাজারে প্রবেশাধিকার বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। পাশাপাশি আসিয়ানের আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলের অংশ হতে পারলে বাংলাদেশ ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে উৎপাদন ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে।

অন্যদিকে, ব্রিকস শুধু একটি অর্থনৈতিক জোট নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের নতুন প্রতীক। এই জোটে সম্পৃক্ত হলে বাংলাদেশ ডলারের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে। একই সঙ্গে ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে তুলনামূলক সহজ শর্তে অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থায়নের সুযোগও বাড়বে। অর্থাৎ আসিয়ান যেখানে বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার ও আঞ্চলিক সংযোগের দ্বার খুলে দিতে পারে, সেখানে ব্রিকস দিতে পারে বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো ও কৌশলগত ভারসাম্য।

বাংলাদেশও এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পূর্বমুখী কূটনীতিতে নতুন গতি এনেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফরে আসিয়ান ও ব্রিকসে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মালয়েশিয়া আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আগ্রহকে সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে। অন্যদিকে, চীন ব্রিকসে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে, বাংলাদেশ এখন বহুমাত্রিক কূটনীতিকে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে এবং কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়।

তবে এই দুটি জোটের সীমাবদ্ধতাও এড়ানোর সুযোগ নেই। আসিয়ানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বৈচিত্র্য সত্ত্বেও সদস্যদেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বজায় রাখা। কিন্তু ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির কারণে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের মতো মানবিক বিপর্যয়ে জোটটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

অন্যদিকে, ব্রিকসের অন্যতম সাফল্য হলো পশ্চিমা অর্থনৈতিক আধিপত্যের বাইরে একটি বিকল্প অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা। কিন্তু ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধসহ সদস্যদেশগুলোর ভূরাজনৈতিক মতপার্থক্য জোটটির কার্যকারিতাকে অনেক ক্ষেত্রে সীমিত করেছে। ফলে অভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থা বা সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলো এখনো প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।

তবু বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ‘আসিয়ান’ ও ‘ব্রিকস’ বিশ্ব অর্থনীতির দুই গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। সার্কের স্থবিরতার যুগে বাংলাদেশের সামনে বিকল্প আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ছাড়া কার্যত অন্য কোনো বাস্তবসম্মত পথ নেই। সরকারের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। তবে তা যেন কেবল আনুষ্ঠানিক সফর ও যৌথ ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থাকে। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার, দক্ষ কূটনীতি এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক লবিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আসিয়ান ও ব্রিকসের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে হবে। কারণ, পূর্বমুখী এই অর্থনৈতিক জোয়ারে নিজেদের যথাসময়ে সম্পৃক্ত করতে না পারলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে পড়বে।