ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সমাপ্তির লক্ষ্যে মার্কিন প্রশাসন পরস্পর সাংঘর্ষিক দুটি চুক্তি সই করেছে। ইরানের ওপর শান্তির শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার যে ক্ষমতা ইসরায়েল হারিয়েছিল, সেটি তারা এখন লেবাননে ফিরে পেতে চাইছে। এতে ইসরায়েলকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে খোদ লেবানন সরকার।

প্রথম চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালিও অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে দ্বিতীয় চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলের ওপর লেবাননের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানানোর কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। উল্টো ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে একটি ‘সামরিক সমন্বয় গোষ্ঠী’ গঠনের মাধ্যমে লেবাননের সার্বভৌমত্বকে আরও দুর্বল করা হয়েছে।

এই চুক্তি অনুযায়ী, লেবাননের সেনাবাহিনীকে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে অভিজ্ঞ সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করতে বাধ্য করা হচ্ছে। তা ছাড়া এই রূপরেখা চুক্তি লেবানন সরকারকে বাধ্য করছে যাতে তারা আগ্রাসনের সময় যুদ্ধাপরাধে জড়িত ইসরায়েলি সেনা ও জেনারেলদের দায়মুক্তি দেয়।

লেবাননে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং অন্তত ৮ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।

লেবাননের এমপি এবং আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞ হালিমা কাকুরের মতে, ‘এই ধারা লেবানন কর্তৃপক্ষের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। তারা ইসরায়েলি প্রত্যাহারের বিনিময়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অথচ ইসরায়েলি প্রত্যাহার লেবাননের একটি অধিকার, এর জন্য কোনো কিছুর বিনিময় করার প্রয়োজন থাকার কথা ছিল না।’

এই চুক্তির পর বৈরুতের রাস্তায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরি প্রতিজ্ঞা করেছেন যে সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ এড়াতে তিনি এই চুক্তি পাস হতে দেবেন না। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম বেরিকে পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য ধন্যবাদ জানাতে বাধ্য হন।

ইসরায়েল ও তুরস্ক কখন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে?

নাবিহ বেরি বলেন, ‘যারা এই চুক্তি তৈরি করেছে, তারা দেশে একটি গৃহবিবাদ তৈরি করতে চায়। কিন্তু আমি তা চাই না এবং এই পরিস্থিতি রুখতে চাপ দিচ্ছি।’ বেরি আরও জানান, মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের এক ‘রশি–টানাটানি’র খেসারত পুরো অঞ্চলকে দিতে হতে পারে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটন চুক্তি নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত। নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ইরানের জন্য একটি ‘বড় ধাক্কা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘ইরান জোরপূর্বক আমাদের দক্ষিণ লেবানন থেকে হটানোর চেষ্টা করছিল। কার্যত ইসরায়েল, লেবানন ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের বলে দিয়েছে: এটি তোমাদের বিষয় নয়।’

মার্কিন প্রশাসনের দুজন ভিন্ন ভাবধারার ব্যক্তির ‘রশি–টানাটানি’র কারণেই এই দুটি চুক্তি এতটা ভিন্ন হয়েছে। ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তিটি মূলত ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের চিন্তাভাবনার প্রতিফলন। ইরানের ওপর যৌথ হামলার ঘোর বিরোধী ছিলেন ভ্যান্স।

‘সুন্নি অক্ষ’ জুজু

অন্যদিকে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যকার ওয়াশিংটন ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিটি তৈরি করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। রুবিও মনে করেন, রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে নয়; বরং শান্তির পূর্বশর্ত হিসেবেই হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে হবে এবং এই অঞ্চলে ইসরায়েলকে একমাত্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হবে।

তবে ভ্যান্স ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক ঝুঁকি দেখছেন। অপর দিকে রুবিও এখনো এই অলীক ধারণায় বিশ্বাসী যে হিজবুল্লাহ লেবাননের কেউ নয়, তারা কেবলই ইরানের একটি হাতিয়ার।

বর্তমানে আঙ্কারার সুর পুরোপুরি বদলে গেছে। তারা এখন বুঝতে পেরেছে যে ইসরায়েল আসন্ন সংঘাতের বিষয়ে যা বলছে, তা গুরুত্বের সঙ্গেই বলছে। তুরস্ক এখন তাদের নৌ, বিমান ও ড্রোনশক্তির মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

ইরান যুদ্ধ ইসরায়েলের আঞ্চলিক পরিকল্পনার জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। কিন্তু তেহরানের সরকার পরিবর্তিত হলেও যে এই যুদ্ধ থামত না, তার প্রমাণ হলো তেল আবিবের রাজনৈতিক মহল এখন তাদের নজর ঘোরাচ্ছে তুরস্কের দিকে।

তুরস্ক এখন ইসরায়েলের নতুন ‘অস্তিত্বের সংকট’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইসরায়েলি রাজনীতিবিদেরা সমস্বরে শঙ্কা প্রকাশ করছেন যে তুরস্ক, সিরিয়া ও কাতারকে নিয়ে একটি নতুন ‘সুন্নি অক্ষ’ তৈরি হচ্ছে।

বিষয়টি ট্রাম্প অবশ্য ভালোভাবে নেননি। নেতানিয়াহু এখন এরদোয়ানকে ‘একজন ইহুদিবিদ্বেষী স্বৈরাচারী’ যিনি ‘কুর্দিদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছেন’ বলে যে দাবি করছেন, ট্রাম্প তা হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। এরদোয়ান সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘এরদোয়ান একজন মহান নেতা, অত্যন্ত শক্তিশালী একজন মানুষ...আমি তাঁর কাছে যা চেয়েছি, তিনি তা–ই করেছেন।’

যখন নেতানিয়াহু বলেন যে ইসরায়েলের নতুন নিরাপত্তানীতি হলো ‘কিল দেম ফার্স্ট’, তখন ভ্যান্স আরও স্পষ্ট ভাষায় জবাব দেন। নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার দুজন অতি ডানপন্থী মন্ত্রীর উদ্দেশে ভ্যান্স বলেন, ‘আপনারা মাত্র ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ। শুধু হত্যা করে আপনারা প্রতিটি জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করতে পারেন না।’

ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে

তবে ইরানকে নিয়ে ইসরায়েল যতটা সিরিয়াস ছিল, তুরস্কের ক্ষেত্রেও তারা ততটাই মরণপণ। প্রথমত, তুরস্কবিরোধী এই মনোভাব ইসরায়েলের সব দলের মধ্যেই বিদ্যমান। নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য উত্তরসূরি নাফতালি বেনেট বলেছেন, ‘আমি সতর্ক করছি, তুরস্কই হলো নতুন ইরান।’

একই সুর শোনা গেছে প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলির কণ্ঠে। তিনি বলেন, ইরানের ‘শিয়াপন্থী সাম্রাজ্যের’ দিন শেষ। তার জায়গায় এখন হেঁটে আসছে এক নতুন অক্ষ—‘এরদোয়ানের তুরস্ক, সিরিয়া ও কাতারের মুসলিম ব্রাদারহুড অক্ষ’।

দ্বিতীয়ত, তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের এই অভিযানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বরে, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনের এক মাস আগে। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডন সার বলেছিলেন, ইসরায়েলের উচিত তাদের মিত্র কুর্দি এবং দ্রুজদের কাছে পৌঁছানো।

আসাদের পতনের পর ইসরায়েল সিরিয়ার নৌ ও বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করে দেয় এবং দক্ষিণ সিরিয়ার একটি বিশাল এলাকা দখল করে নেয়, যা গাজার চেয়েও বড়। তেল আবিব এখন প্রকাশ্যে একটি খণ্ডিত ও যুক্তরাষ্ট্রীয় সিরিয়ার পক্ষে সওয়াল করছে।

নেতানিয়াহু এখন লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় তাঁর বাহিনীর দখল করা এলাকাগুলোকে ‘নিরাপত্তাবেষ্টনী’ বলছেন, যেখান থেকে সরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। এই পদক্ষেপগুলোর উদ্দেশ্য হলো দামেস্কে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন নবগঠিত জাতীয় সরকারের কর্তৃত্বকে সীমিত করা এবং আসাদ–উত্তর সিরিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জ করা।

তুরস্ক যে কারণে নিজেদের ইসরায়েলের চূড়ান্ত টার্গেট মনে করছে

সাইপ্রাস ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যকার উত্তেজনাকেও ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দিচ্ছে। এই সবকিছুর একমাত্র লক্ষ্য হলো তুরস্কের ক্রমবর্ধমান নৌশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করা।

ইসরায়েলের ‘মাআরিভ’ পত্রিকার সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি কৌশলগত মহলে তুরস্ককে এখন ইরানের চেয়েও বড় দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইসরায়েলের আরেক মন্ত্রী গিলা গামলিয়েল তো বলেই ফেলেছেন, ইসরায়েল এখন ‘অটোমান সাম্রাজ্য’ মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সুর বদলাচ্ছে আঙ্কারার

ইসরায়েলের এই তৎপরতার বিপরীতে তুরস্কের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ সতর্ক, কেউ কেউ বলবেন বড্ড বেশি সতর্ক। দেখা যেতে পারে, ইসরায়েল যখন সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে তাদের বিমান ও নৌঘাঁটি ধ্বংস করছিল, তখন তুরস্ক কী করেছিল।

ইসরায়েল যখন সিরিয়ার হামা ও তিয়াস বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়, যেখানে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা ছিল, তখন তুরস্ক ও ইসরায়েল একটি সংঘাত এড়ানোর লাইন নিয়ে আলোচনা করেছিল।

গাজায় হামলা চলাকালেও তুরস্ক আজারবাইজানের তেল তাদের জেহান বন্দরের মাধ্যমে ইসরায়েলে পাঠানো সচল রেখেছিল। সম্ভবত ট্রাম্প এরদোয়ানের কাছে যে ‘অনুরোধ’ করেছিলেন, এটি তারই একটি।

তুর্কি কর্মকর্তারা অবশ্য নেতানিয়াহুর এ ধরনের বক্তব্যকে কেবলই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাল হিসেবে দেখতেন। তাঁরা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে তুর্কি সামরিক বাহিনীর হটলাইন, সিরিয়ায় ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে না জড়ানোর বিষয়ে তুর্কি জেনারেলদের অবস্থান এবং দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগের বিষয়গুলোর ওপর জোর দিতেন।

২০২৪ সালের স্থানীয় নির্বাচনের পর তুরস্কের এই নমনীয় নীতিতে পরিবর্তন আসে। কারণ, গাজা ইস্যুতে নিষ্ক্রিয়তার জন্য এরদোয়ানের ক্ষমতাসীন একে পার্টি নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছিল।

বর্তমানে আঙ্কারার সুর পুরোপুরি বদলে গেছে। তারা এখন বুঝতে পেরেছে যে ইসরায়েল আসন্ন সংঘাতের বিষয়ে যা বলছে, তা গুরুত্বের সঙ্গেই বলছে। তুরস্ক এখন তাদের নৌ, বিমান ও ড্রোনশক্তির মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

ট্রাম্প এখন তুরস্ককে তাদের নতুন প্রজন্মের ‘কান’ স্টিলথ ফাইটার জেট তৈরির ইঞ্জিন সরবরাহ করছেন। অন্যদিকে আঙ্কারা ৬০ হাজার টনের একটি বিমানবাহী রণতরি এবং আরও ৩০টি যুদ্ধজাহাজ তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। সম্প্রতি তারা মিসরীয় নৌবাহিনীর সঙ্গে একটি যৌথ মহড়াও সম্পন্ন করেছে।

তা সত্ত্বেও তুরস্ক মূলত সময়ক্ষেপণ করছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে তুরস্কের নিজস্ব বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হতে আরও তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে।

গাজা সংকটে তুরস্কের মূল প্রতিক্রিয়া ছিল সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি গঠন করা, যে আঞ্চলিক শক্তিগুলো মূলত মার্কিন-ইরান চুক্তি মধ্যস্থতায় সহায়তা করেছিল। ইসরায়েল ঠিক এই জিনিসকেই ভয় পায় এবং এটি ভেস্তে দেওয়ার জন্যই এখন লড়াই করছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে এখন যা–ই ঘটুক না কেন, ইসরায়েল ও এই অঞ্চলের মূল যুদ্ধক্ষেত্রটি তৈরি হবে লেবানন ও সিরিয়ায়।

এই সবকিছুর মূল শিক্ষা হলো, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যখন মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা বদলে দেওয়ার ঘোষণা দেন, তখন তিনি তা গুরুত্বের সঙ্গেই বলেন। আর এটি থামানোর জন্য ‘হার্ড পাওয়ার’ প্রয়োজন।

  • ডেভিড হার্স্ট মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক।

    মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত