আমরা বড়ই অদ্ভুত জাতি। মুখে এক কথা, কাজে আরেক কথা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আঙুলের ডগায় আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী বিপ্লবী। বাস্তবে আবার সবচেয়ে ধৈর্যশীল লাইনের মানুষ। ফেসবুকে সকালবেলা পোস্ট দিই, ‘বয়কট ইন্ডিয়া।’ দুপুরে ইউটিউবে ভারতবিরোধী বক্তৃতা শুনি। বিকেলে ভারতীয় সিরিয়ালের আপডেট দেখি। আর পরদিন ভোরে ভারতীয় ভিসার লাইনে গিয়ে দাঁড়াই। এই দৃশ্য দেখে ব্যঙ্গও হাসে, যুক্তিও মাথা চুলকায়।
দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর ভারত আবার বাংলাদেশিদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করেছে। তারপর যা ঘটল, তা যেন কোনো জনপ্রিয় সিনেমার প্রথম দিনের প্রথম শো। ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভিসা আবেদন কেন্দ্রে মানুষের ঢল নেমেছে। শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনার কেন্দ্রেও একই চিত্র। মাত্র দুই সপ্তাহে এক লাখ চল্লিশ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি আমাদের বাস্তবতার আয়না।
অথচ এই সময়টাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বয়কট ইন্ডিয়া’ স্লোগানও কম শোনা যায়নি। মনে হচ্ছিল, যেন আগামীকাল থেকেই বাংলাদেশের কেউ আর ভারতে যাবে না। কিন্তু ভিসা চালু হতেই বোঝা গেল, স্লোগান আর প্রয়োজনের মধ্যে দূরত্ব অনেকটা পদ্মা আর বঙ্গোপসাগরের মতো। মানচিত্রে কাছাকাছি মনে হলেও বাস্তবে বিস্তর ফারাক।
অবশ্য এই ভিড় দেখে শুধু হাসাহাসি করলে ভুল হবে। এই লাইনের প্রতিটি মানুষের পেছনে একটি করে গল্প আছে। কেউ চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন। কারও সন্তানের পড়াশোনার প্রয়োজন। কেউ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে চান। কেউ ব্যবসার কাজে যাচ্ছেন। কেউ আবার বহুদিনের জমে থাকা ভ্রমণের ইচ্ছা পূরণ করতে চান। তাদের কাছে রাজনীতি নয়, প্রয়োজনটাই বড়।
রাজনীতির ভাষা আর মানুষের ভাষা এক নয়। রাজনীতি প্রায়ই পতাকা দেখে। সাধারণ মানুষ দেখে হাসপাতালের প্রেসক্রিপশন। রাজনীতি সীমান্ত দেখে। একজন অসুস্থ মানুষ দেখে অপারেশনের তারিখ। রাজনীতি আবেগ দিয়ে হিসাব করে। সংসার চলে প্রয়োজনের অঙ্কে।
এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে।
আমাদের দেশে এখন বয়কট যেন নতুন এক ফ্যাশন। কোনো দেশকে বয়কট। কোনো পণ্যকে বয়কট। কোনো শিল্পীকে বয়কট। কোনো প্রতিষ্ঠানকে বয়কট। মনে হয়, পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান যেন একটি হ্যাশট্যাগের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। অথচ বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি পোস্ট দিয়ে অর্থনীতি বদলায় না। মানুষের জীবনযাত্রাও বদলে যায় না।
বয়কটের ডাক দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু বিকল্প তৈরি করা কঠিন। ধরা যাক, একজন রোগীর হার্টের জটিল অস্ত্রোপচার দরকার। তিনি যদি দ্রুত চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে চান, তাহলে তাকে কী বলব? ফেসবুকের পোস্ট পড়ে সুস্থ হয়ে যান? কিংবা একজন ব্যবসায়ী, যিনি বছরের পর বছর দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা করছেন। তিনি কি হঠাৎ আবেগ দিয়ে তার ব্যবসা বন্ধ করে দেবেন? একজন মা, যার মেয়ে ওপারে থাকে, তিনি কি শুধু রাজনৈতিক স্লোগানের কারণে সন্তানের মুখ দেখা বন্ধ করবেন?
মানুষের জীবন কখনোই এত সরল নয়। এখানে আরেকটি বিষয়ও আমাদের ভাবতে হবে। যদি সত্যিই এত মানুষ চিকিৎসা, কেনাকাটা বা বিভিন্ন প্রয়োজনে ভারতে যেতে বাধ্য হন, তাহলে প্রশ্নটি ভারতের নয়, আমাদের নিজেদের প্রতিও যায়। কেন আমাদের হাসপাতালগুলো এমন আস্থা তৈরি করতে পারল না? কেন আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি? কেন অনেক মানুষ মনে করেন, সীমান্ত পার হলেই হয়তো একটু ভালো চিকিৎসা মিলবে?
এগুলো শুধু ভারতের সাফল্যের গল্প নয়। অনেকটাই আমাদের ঘাটতির গল্প। প্রতিবছর চিকিৎসা ও কেনাকাটার জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যায়। এই অর্থ যদি দেশের হাসপাতাল, গবেষণা, চিকিৎসা প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ হতো, তাহলে হয়তো একদিন উল্টো দৃশ্যও দেখা যেত। অন্য দেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশে আসতেন। স্বপ্নটি অসম্ভব নয়। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে স্লোগান নয়, নীতিমালা দরকার। বক্তৃতা নয়, বিনিয়োগ দরকার। আবেগ নয়, দক্ষতা দরকার।
ভারতও নিশ্চয়ই সব ক্ষেত্রে আদর্শ নয়। দুই দেশের মধ্যে নানা রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সীমান্তসংক্রান্ত বিরোধ আছে। সেগুলো নিয়ে সমালোচনা হতেই পারে। একটি রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করা গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, তাহলে সেটি যুক্তি নয়, আত্মপ্রবঞ্চনা হয়ে যায়।
আমরা অনেক সময় রাষ্ট্র, সরকার এবং সাধারণ মানুষকে এক কাতারে ফেলে দিই। এটি বড় ভুল। একটি দেশের সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তাই বলে সেই দেশের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি হাসপাতাল, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিটি সম্পর্ককে একই চোখে দেখা যুক্তিসঙ্গত নয়। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই স্বার্থ দিয়ে সম্পর্ক চালায়। নাগরিকরাও প্রয়োজন দিয়ে জীবন চালান।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে জোরে যারা বয়কটের স্লোগান দেন, তাদের অনেকের পাসপোর্টে হয়তো ভারতীয় ভিসার সিলও রয়েছে। এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ মানুষ অনেক সময় নিজের বিশ্বাসের চেয়ে নিজের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এটি ভণ্ডামি হতে পারে। আবার এটিই বাস্তবতাও হতে পারে।
আমরা আসলে দুই পৃথিবীতে বাস করি। একটি ভার্চ্যুয়াল পৃথিবী, যেখানে একটি পোস্ট দিয়েই বিপ্লব ঘটে যায়। আরেকটি বাস্তব পৃথিবী, যেখানে হাসপাতালের বেড, সন্তানের ভর্তি, ব্যবসার চুক্তি এবং আত্মীয়ের অসুস্থতা অপেক্ষা করে না। প্রথম পৃথিবীতে লাইক পাওয়া যায়। দ্বিতীয় পৃথিবীতে জীবন চলে।
ভারতীয় ভিসার সামনে দীর্ঘ লাইন তাই কেবল একটি প্রশাসনিক ঘটনা নয়। এটি আমাদের সমাজের একটি প্রতিচ্ছবি। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, স্লোগানের চেয়ে প্রয়োজনের শক্তি বেশি। আবেগের চেয়ে বাস্তবতার ওজন বেশি। রাজনৈতিক উত্তেজনার চেয়ে একজন সাধারণ মানুষের জীবন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সম্ভবত এটাই সময় নিজেদের একটু আয়নায় দেখার। আমরা কি সত্যিই বয়কট চাই, নাকি শুধু বয়কটের ভাষা ভালোবাসি? আমরা কি সত্যিই বিকল্প তৈরি করেছি, নাকি শুধু বিকল্পের গল্প বলেছি? আমরা কি বাস্তব পরিবর্তন চাই, নাকি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৈতিক বিজয়ের আনন্দ খুঁজি?
ভিসার সেই দীর্ঘ লাইন একটি কঠিন সত্য শিখিয়ে দিয়েছে। মুখের ভাষা আর জীবনের ভাষা সব সময় এক নয়। মানুষ শেষ পর্যন্ত স্লোগানের কাছে নয়, প্রয়োজনের কাছেই আত্মসমর্পণ করে। কারণ ইতিহাসে যত বিপ্লবই লেখা থাকুক, সংসারের অভিধানে সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দটির নাম এখনো ‘প্রয়োজন’।
এইচআর/এএসএম








