বাংলাদেশে বর্ষা একসময় ছিল জীবনের উৎসব। কৃষকের মাঠে নতুন আশার বার্তা, নদীর বুকে প্রাণের সঞ্চার, প্রকৃতির নবজাগরণের প্রতীক ছিল বর্ষাকাল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষা যেন তার স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়েছে। বৃষ্টি এখন আর কেবল আশীর্বাদ নয়; অনেক সময় তা আতঙ্কের আরেক নাম। কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতেই ডুবে যায় শহর, তলিয়ে যায় গ্রাম, পাহাড়ে নামে ধস, নদী উপচে পড়ে জনপদে, আর লাখো মানুষ হারায় নিরাপদ আশ্রয়। যে বৃষ্টি একসময় জীবন বাঁচাত, সেই বৃষ্টিই এখন জীবন ও জীবিকার সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বছরের বর্ষায়ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ফেনী, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় টানা বৃষ্টিতে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটে, নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। হাজার হাজার পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়। কৃষিজমি, মাছের ঘের, সড়ক, সেতু ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও বন্যায় বহু মানুষের মৃত্যু ঘটেছে এবং লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রও জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে চরম আবহাওয়া এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং তা নতুন বাস্তবতা। আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (আইপিসিসি) তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ সেই ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, উজানের পানি, বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছ্বাস এবং স্থানীয় বৃষ্টিপাত—এই তিনটির সম্মিলিত প্রভাব প্রায়ই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু প্রকৃতিকে দায়ী করলে সমস্যার মূল কারণ আড়াল হয়ে যায়। আমাদের নিজেদের উন্নয়ন পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা, নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নদী দখল, খাল ভরাট, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জলাধার ধ্বংস পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
দুর্যোগ কখনো কেবল প্রাকৃতিক নয়; অনেক ক্ষেত্রেই তা মানবসৃষ্ট ঝুঁকির ফল। প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়, সহাবস্থানই হতে পারে টেকসই সমাধান। নদীকে নদীর মতো, পাহাড়কে পাহাড়ের মতো এবং জলাভূমিকে জলাভূমির মতো থাকতে দিতে হবে। উন্নয়ন যদি প্রকৃতির বিরুদ্ধে যায়, তাহলে সেই উন্নয়নের মূল্য শেষ পর্যন্ত মানুষকেই দিতে হয়।
ঢাকা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সামান্য কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাজধানীর বহু এলাকা পানির নিচে চলে যায়। যানজট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ব্যবসায়িক ক্ষতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, রোগব্যাধির বিস্তার—সব মিলিয়ে নগরজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। নগর বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরে বলে আসছেন, ঢাকার শতাধিক খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ দখল ও ভরাট হওয়ার কারণে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ড্রেন নির্মাণ করা হলেও পানি দ্রুত নামার পথ না থাকলে সেই অবকাঠামো কার্যকর হয় না।
পাহাড়ি অঞ্চলের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলাগুলোয় প্রতিবছর পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যু যেন এক অনিবার্য ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অবৈধভাবে পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ, বন উজাড় এবং পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন পাহাড়কে দুর্বল করে দিয়েছে। প্রবল বৃষ্টিতে সেই পাহাড় ভেঙে পড়ে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। প্রায় প্রতি বছরই একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে, একই ধরনের তদন্ত হয়, একই ধরনের সুপারিশ দেওয়া হয়; কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন খুব কমই দেখা যায়।
গ্রামীণ অর্থনীতির ওপরও অতিবৃষ্টি ও বন্যার প্রভাব গভীর। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। অতিবৃষ্টিতে ধানের জমি তলিয়ে যায়, সবজি নষ্ট হয়, গবাদিপশু মারা যায়, মাছের খামার ভেসে যায়। কৃষক ঋণের বোঝা নিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে বাধ্য হন। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এখন খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, জনস্বাস্থ্যের ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। বন্যার পর বিশুদ্ধ পানির সংকট, ডায়রিয়া, চর্মরোগ, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। শিশু, নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন। নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের চেয়ে দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ অনেক বেশি কার্যকর—এ কথা বহু গবেষণায় প্রমাণিত হলেও আমাদের বাজেট ও পরিকল্পনায় সেই প্রতিফলন এখনও যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী দেশগুলোর একটি। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে আমাদের অবদান এক শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। এই বৈষম্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু ন্যায্যতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত জলবায়ু অর্থায়ন বাস্তবায়নে ধীরগতি বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন সক্ষমতাকে সীমিত করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন, কিন্তু নিজের ঘরও আগে গুছিয়ে নিতে হবে।
প্রশ্ন হলো, এই দুর্ভোগ থেকে স্বস্তি কোথায়?
স্বস্তির পথ রয়েছে, তবে তা কেবল ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা। শহর ও গ্রামের জন্য আলাদা অভিযোজন কৌশল তৈরি করতে হবে। নদী, খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধারকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। নগর পরিকল্পনায় জলাধার সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। যেসব এলাকায় নিয়মিত জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, সেখানে বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ পরিকল্পনা ছাড়া নতুন আবাসন বা বাণিজ্যিক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়।
পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ বসতি নির্মাণ কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। পাহাড় কাটা ও বন উজাড়ের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে নিরাপদ পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কেবল উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর করতে হবে। মোবাইল ফোন, কমিউনিটি রেডিও, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় যে সক্ষমতা অর্জন করেছে, একই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ বন্যা ও অতিবৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রয়োজন।
কৃষিতে জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্বল্পমেয়াদি ও জলসহিষ্ণু ফসলের জাত, উন্নত বীজ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সহজ শস্যবিমা এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরও সক্ষম করতে হবে, যাতে দুর্যোগের প্রথম ধাক্কা স্থানীয় পর্যায়েই সামাল দেওয়া যায়।
একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—দুর্যোগ কখনো কেবল প্রাকৃতিক নয়; অনেক ক্ষেত্রেই তা মানবসৃষ্ট ঝুঁকির ফল। প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়, সহাবস্থানই হতে পারে টেকসই সমাধান। নদীকে নদীর মতো, পাহাড়কে পাহাড়ের মতো এবং জলাভূমিকে জলাভূমির মতো থাকতে দিতে হবে। উন্নয়ন যদি প্রকৃতির বিরুদ্ধে যায়, তাহলে সেই উন্নয়নের মূল্য শেষ পর্যন্ত মানুষকেই দিতে হয়।
বাংলাদেশ অতীতে বহু দুর্যোগ মোকাবিলা করে বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। আমাদের রয়েছে দক্ষ স্বেচ্ছাসেবক, সচেতন জনগোষ্ঠী, অভিজ্ঞ প্রশাসন এবং শক্তিশালী সামাজিক সংহতি। এই শক্তিগুলোকে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, সুশাসন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
বর্ষা থামবে, বন্যার পানি একদিন নেমেও যাবে। কিন্তু যদি একই ভুল, একই অব্যবস্থাপনা এবং একই অবহেলা থেকে যায়, তাহলে আগামী বর্ষায় আবারও আমরা একই প্রশ্ন করব—স্বস্তি কোথায়? সেই প্রশ্নের উত্তর প্রকৃতির কাছে নয়; উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের নীতি, পরিকল্পনা, দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎকে আজই নতুন করে গড়ে তোলার সাহসে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]
এইচআর/এমএফএ/এএসএম








