বাংলাদেশে বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। নদীমাতৃক এই দেশের ইতিহাস, ভূগোল ও জীবনযাত্রার সঙ্গে বর্ষা ও বন্যার সম্পর্ক বহু পুরোনো। কিন্তু জুলাই ২০২৬-এর বন্যা আমাদের এমন একটি বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে, যা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এবারের বন্যা দেখিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বন্যা আর শুধু মানুষের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেওয়ার ঘটনা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতিকে নীরবে দুর্বল করে দেওয়া একটি কাঠামোগত সংকট।
সাধারণত বন্যার খবর মানেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পানিবন্দী মানুষের ছবি, ত্রাণের জন্য অপেক্ষমাণ পরিবার, ভেঙে যাওয়া সড়ক কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়া শিশুদের মুখ। এবারের বন্যায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজারে টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধস জনজীবন বিপর্যস্ত করেছে। রোহিঙ্গা শিবিরেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কয়েক লাখ পরিবার পানিবন্দী হয়েছে, বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, কৃষিজমি, ঘরবাড়ি ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কিন্তু এই দৃশ্যগুলোর মধ্যেও একটি ঘটনা আলাদা করে আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে—রাজধানী ঢাকার অচল হয়ে পড়া।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার ভারী বর্ষণে ধানমন্ডি, মিরপুর, মালিবাগ, মৌচাক, মতিঝিল, কারওয়ান বাজার থেকে পুরান ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে যায়। অফিসগামী মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকেন, গণপরিবহন ভেঙে পড়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। রাজধানীর এই কয়েক ঘণ্টার অচলাবস্থা একটি বড় সত্য সামনে নিয়ে আসে—জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর সীমান্তবর্তী কোনো হাওর বা পাহাড়ি জনপদের সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোকেও সমানভাবে আঘাত করছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বন্যা থামানো নয়; বরং এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা বন্যার ধাক্কা সামলেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। যেখানে কৃষক সর্বস্বান্ত হবেন না, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হবেন না, একটি মহাসড়ক ডুবে গেলে পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে না, এবং রাজধানী কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে অচল হয়ে যাবে না।
এখানেই জুলাইয়ের বন্যার প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত। আমরা এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন একই সপ্তাহে সিলেটে উজানের ঢল, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমিধস, কক্সবাজারে অতিবৃষ্টি এবং ঢাকায় নগর জলাবদ্ধতা—সবকিছু একসঙ্গে ঘটতে পারে। অর্থাৎ দুর্যোগের ধরন বদলে গেছে। নদীর বন্যা, আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি, নগর জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ধস—এগুলো আর আলাদা ঘটনা নয়; বরং একই জলবায়ুগত সংকটের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ।
এই পরিবর্তনের জন্য শুধু প্রকৃতিকে দায়ী করলে ভুল হবে। গত কয়েক দশকে উন্নয়নের নামে আমরা অসংখ্য নদী, খাল ও জলাভূমি ভরাট করেছি। শহরের প্রাকৃতিক জলাধার হারিয়ে গেছে, পাহাড় কেটে বসতি গড়ে উঠেছে, নদীর প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিকল্পনাহীনভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে প্রকৃতি যখন স্বাভাবিক নিয়মে অতিরিক্ত পানি নামাতে চায়, তখন সেই পানির জন্য আর পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। পানি তাই মানুষের ঘর, রাস্তা, বাজার ও শিল্পাঞ্চলের ভেতর দিয়ে নিজের পথ তৈরি করে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সাম্প্রতিক তথ্যও সেই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে। কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর বিভিন্ন অংশ বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হয়েছে এবং উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একাধিক জেলাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের মেঘালয়, ত্রিপুরা ও আসাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উজানের ঢল আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের বন্যা এখন আর কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাতের ফল নয়; এটি একটি আন্তঃসীমান্ত নদী অববাহিকার বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব।
কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় ভুলটি ঘটে বন্যার ক্ষতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে। আমরা সাধারণত হিসাব করি কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কত কিলোমিটার সড়ক ভেঙেছে, কত ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে কিংবা কত টন ফসল নষ্ট হয়েছে। অথচ এসবের আড়ালে থেকে যায় অর্থনীতির সেই ক্ষত, যা দৃশ্যমান নয় কিন্তু অনেক বেশি গভীর।
একজন কৃষক যখন জমিতে বীজ বোনেন, তখন তিনি শুধু ধান ফলান না; তিনি নিজের সঞ্চয়, ঋণ, শ্রম ও ভবিষ্যতের আশা জমিতে বিনিয়োগ করেন। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দোকানের পণ্য কিনতে ঋণ নেন। একজন মাছচাষি পোনা, খাদ্য ও অবকাঠামোতে পুঁজি বিনিয়োগ করেন। একজন রিকশাচালক কিংবা দিনমজুর প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করে পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করেন। বন্যা যখন আসে, তখন শুধু জমি বা ঘর নয়—এই মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ আয়ও পানির নিচে তলিয়ে যায়।
এ কারণেই বন্যার প্রকৃত ক্ষতি কখনো কেবল টাকার অঙ্কে ধরা যায় না। এটি মানুষের উৎপাদনক্ষমতা কমিয়ে দেয়, সঞ্চয় শেষ করে, ঋণের বোঝা বাড়ায় এবং দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার পথকে আরও দীর্ঘ করে তোলে। অর্থনীতির ভাষায় এটিই হলো অদৃশ্য ক্ষতি—যে ক্ষতির হিসাব জাতীয় আয়ের পরিসংখ্যানে খুব কমই প্রতিফলিত হয়, কিন্তু যার প্রভাব বহু বছর ধরে থেকে যায়।
বাংলাদেশ গত দুই দশকে প্রবৃদ্ধি অর্জনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু জুলাই ২০২৬-এর বন্যা একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে—আমাদের প্রবৃদ্ধি কি সত্যিই জলবায়ু-সহনশীল? যদি কয়েক দিনের বন্যায় কৃষি, পর্যটন, সরবরাহব্যবস্থা, নগর অর্থনীতি এবং মানুষের জীবিকা একসঙ্গে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তবে উন্নয়নের বর্তমান কাঠামোকে নতুন করে ভাবার সময় কি আসেনি?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আগামী দিনের বাংলাদেশ শুধু দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ হবে, নাকি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম একটি স্থিতিস্থাপক অর্থনীতিতেও পরিণত হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর আন্তঃনির্ভরশীলতা। কৃষি, শিল্প, পরিবহন, বন্দর, পর্যটন ও নগর অর্থনীতি—সবই এখন একই সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশ। ফলে সিলেটের একটি হাওরে বা বান্দরবানের একটি পাহাড়ি সড়কে যে বিপর্যয় ঘটে, তার অভিঘাত খুব দ্রুত ঢাকার বাজার, গাজীপুরের কারখানা কিংবা চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমেও পৌঁছে যায়। এ কারণেই জুলাইয়ের বন্যাকে আঞ্চলিক দুর্যোগ হিসেবে নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
এই ধাক্কার প্রথম আঘাত আসে কৃষিতে। আমরা সাধারণত ক্ষতির হিসাব করি কত হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে বা কত টন ধান নষ্ট হয়েছে। কিন্তু কৃষি অর্থনীতির প্রকৃত ক্ষতি তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। একটি মৌসুমের ফসল নষ্ট হওয়ার অর্থ শুধু উৎপাদন কমে যাওয়া নয়; এর অর্থ কৃষকের বিনিয়োগ হারিয়ে যাওয়া। বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, জমি প্রস্তুতের ব্যয়—সবই আগেই খরচ হয়ে যায়। এসব ব্যয়ের বড় অংশই আসে ব্যাংক, এনজিও বা অনানুষ্ঠানিক ঋণের মাধ্যমে। বন্যার পরে ফসল থাকে না, কিন্তু ঋণের কিস্তি থেকে যায়।
ফলে কৃষকের সংকট শুধু কৃষিক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা গ্রামীণ অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকের হাতে অর্থ না থাকলে স্থানীয় বাজারে কেনাকাটা কমে যায়, কৃষিযন্ত্রের ব্যবসা কমে, পরিবহন ব্যাহত হয়, এমনকি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও এর প্রভাব পড়ে। অর্থনীতিবিদেরা একে মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট বলেন—একটি খাতের ক্ষতি ধীরে ধীরে পুরো স্থানীয় অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়।
হাওরাঞ্চলে এই বাস্তবতা আরও গভীর। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার শুধু বন্যাপ্রবণ অঞ্চল নয়; এগুলো দেশের খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এখানকার কৃষক যদি টানা দুই বা তিন মৌসুম ক্ষতির মুখে পড়েন, তবে তার প্রভাব জাতীয় খাদ্যবাজারেও পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন তাই শুধু উৎপাদনের নয়; উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করারও প্রশ্ন।
একই ধরনের চাপ পড়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে। বন্যার পানিতে পুকুরের মাছ ভেসে যায়, হ্যাচারির উৎপাদন ব্যাহত হয়, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর ক্ষতি হয়। এসব ক্ষতির পুনরুদ্ধারে কয়েক সপ্তাহ নয়, অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস লেগে যায়। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে, দাম বাড়ে এবং সাধারণ ভোক্তাকেও তার মূল্য দিতে হয়।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক বাস্তবতা আবার ভিন্ন। চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজারে বন্যার সঙ্গে যুক্ত হয় পাহাড়ধসের ঝুঁকি। একটি পাহাড়ি সড়ক ধসে গেলে শুধু কয়েকটি গ্রামের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় না; কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে পারে না, পর্যটন থেমে যায়, স্থানীয় ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়ে। কক্সবাজারে কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়াই শত শত হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ব্যবসা এবং সৈকতনির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। পর্যটন খাতের এই ক্ষতি প্রায়ই সরকারি পরিসংখ্যানে আলাদা করে দৃশ্যমান হয় না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের বিশেষ বাস্তবতা। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধস শুধু প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ায় না; নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং আশ্রয় ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের ব্যয়ও বেড়ে যায়। অর্থাৎ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্রুত মানবিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক—তিন ধরনের চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়।
কিন্তু জুলাইয়ের বন্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অভিঘাত সম্ভবত সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের মূল ভরসা সড়কপথ। কোনো একটি মহাসড়ক প্লাবিত হলে কিংবা আঞ্চলিক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে কৃষিপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্য—সবকিছুর সরবরাহ ব্যাহত হয়। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, বাজারে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ঢাকা–চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোরের গুরুত্ব এখানেই। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। এই করিডোরে সামান্য বিঘ্নও শিল্প উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলে। তৈরি পোশাক শিল্প, যা বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস, সময়মতো কাঁচামাল না পেলে কিংবা প্রস্তুত পোশাক বন্দরে পাঠাতে বিলম্ব হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। বিশ্ববাজারে এখন শুধু কম দামে উৎপাদন যথেষ্ট নয়; নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায় মূল্যস্ফীতিতে। যখন কৃষি উৎপাদন কমে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বল হয়, তখন বাজারে চাল, শাকসবজি, মাছ, ডিম ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। এটি কেবল বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি জলবায়ু ঝুঁকিরও অর্থনৈতিক প্রতিফলন। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত নীতির পাশাপাশি দুর্যোগ-সহনশীল সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলাও সমান জরুরি।
জুলাইয়ের বন্যা তাই আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হয়েছে, কিন্তু সেই অর্থনীতির ভিত্তি এখনো পর্যাপ্তভাবে জলবায়ু-সহনশীল নয়। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, কিন্তু স্থিতিস্থাপকতা একই হারে বাড়েনি। এই বৈপরীত্য দূর করতে না পারলে ভবিষ্যতের প্রতিটি বড় বন্যাই শুধু মানুষের ঘরবাড়ি নয়, দেশের উন্নয়নের গতিকেও বারবার পিছিয়ে দেবে।জুলাইয়ের বন্যা আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনাকে এখন আলাদা দুটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বন্যা, অতিবৃষ্টি, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও ভূমিধস এখন উন্নয়ন অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু। অর্থাৎ সড়ক, বন্দর, শিল্পাঞ্চল, আবাসন, কৃষি বা নগর উন্নয়ন—যে খাতের কথাই বলা হোক না কেন, জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনা না করলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অবকাঠামোর কতটা ভবিষ্যতের জলবায়ুগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? ঢাকার সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতা দেখিয়েছে, শুধু ড্রেন নির্মাণ করলেই সমাধান হয় না; প্রাকৃতিক জলাধার, খাল ও বৃষ্টির পানি ধারণব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার করতে হয়। একইভাবে গ্রামীণ সড়ক বা মহাসড়ক নির্মাণের সময় নদী ও জলপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথ বিবেচনায় না নিলে সেই সড়কই পরে জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এখানেই “জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো” ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি সড়ক, সেতু বা ড্রেনেজ ব্যবস্থার প্রকৃত মূল্য শুধু নির্মাণ ব্যয়ে নয়; বরং তা ভবিষ্যতের ক্ষতি কতটা কমাতে পারবে, তার ওপর নির্ভর করে। অর্থনীতির ভাষায় এগুলো ব্যয় নয়, বরং প্রতিরোধমূলক বিনিয়োগ। আজ যে অর্থ জলবায়ু অভিযোজনে ব্যয় হবে, তা ভবিষ্যতে বহু গুণ বেশি ক্ষতি প্রতিরোধ করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি জরুরি ক্ষেত্র হলো কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার আর্থিক সুরক্ষা। বর্তমানে একজন কৃষক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রায় পুরো ঝুঁকিই একা বহন করেন। একটি বন্যায় ফসল নষ্ট হলে বা দোকানের পণ্য ভেসে গেলে তাঁর সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়, ঋণের বোঝা বাড়ে এবং পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে অনেক বছর লেগে যায়। তাই রাষ্ট্র-সমর্থিত ফসল বীমা, আবহাওয়া-সূচকভিত্তিক ক্ষতিপূরণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য দুর্যোগ পুনরুদ্ধার তহবিল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে এই পথে এগিয়েছে। নেদারল্যান্ডস নদীকে কংক্রিটের দেয়ালে আটকে রাখার পরিবর্তে নদীর জন্য জায়গা তৈরি করেছে। কেনিয়া ও ফিলিপাইনে আবহাওয়া-ভিত্তিক কৃষি বীমা কৃষকদের ক্ষতি দ্রুত পুষিয়ে দিতে সহায়তা করছে। বাংলাদেশও বিগত সরকার “ডেল্টা প্ল্যান ২১০০”-এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি কাঠামো তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনাকে বাস্তব প্রকল্প, বাজেট বরাদ্দ এবং স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তবায়নের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করা হবে কি না তা অনিশ্চিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসিকতার পরিবর্তন। আমরা এখনো বন্যাকে মূলত একটি জরুরি অবস্থা হিসেবে দেখি—ত্রাণ, উদ্ধার, পুনর্বাসন। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বন্যা একটি পুনরাবৃত্ত অর্থনৈতিক ঝুঁকি। এই ঝুঁকিকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে গ্রহণ না করলে প্রতি বছর একই ধরনের ক্ষতি পুনরাবৃত্তি হবে।
জুলাইয়ের বন্যা কয়েক সপ্তাহ পর হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনাম থেকে সরে যাবে। পানি নেমে যাবে, সড়ক মেরামত হবে, বাজার খুলবে, মানুষ আবার কাজে ফিরবে। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্নটি থেকে যাবে—আমরা কি এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেব? নাকি আগামী বর্ষায় আবার একই দৃশ্য দেখব?
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বন্যা থামানো নয়; বরং এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা বন্যার ধাক্কা সামলেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। যেখানে কৃষক সর্বস্বান্ত হবেন না, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হবেন না, একটি মহাসড়ক ডুবে গেলে পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে না, এবং রাজধানী কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে অচল হয়ে যাবে না।
প্রবৃদ্ধির প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তা জলবায়ুর অভিঘাত সহ্য করার সক্ষমতাও অর্জন করবে। জুলাইয়ের বন্যা আমাদের সেই কঠিন কিন্তু অপরিহার্য সত্যটিই আবার মনে করিয়ে দিল।
লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।
এইচআর/এএসএম








