‘ঘটনা ঘটছে কতদিন হয়া গেল, আর লাশ পাঠাইলো আজকা! এতগুলা দিন আমি ঘুমাইতে পারি নাই। আগুনে আমার ছেলে দুইটারে এক্কেবারে কয়লা বানায়া দিছে। নিজের চোখটারে বিশ্বাস করতে পারতেছি না, এরা আমার সেই সোনা বাজান। আল্লাহ, তুমি আমারে এত বড় কষ্ট কেন দিলা?’

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামের ময়না খাতুনের এই আহাজারিতে চোখ ভিজে যাচ্ছিল আশেপাশের সবার। দুই ছেলে হারানোর যন্ত্রণা তাঁর বুকের ভেতরটাকে যেমন দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছিল, তেমনি কষ্ট দিচ্ছিল পুরো গ্রামবাসীকে। আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় উপজেলার মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ মাঠে সাত লাশের একসঙ্গে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলে নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান স্বজনরা।

লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামগুলোর সড়কে ঢুকতেই কান্নার রোল পড়ে যায় চারদিকে। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স দেখে আর্তনাদে ভেঙে পড়েন স্বজনরা। কেউ দুই হাত তুলে সন্তানের বেহেশত কামনা করছিলেন, কেউ আবার শেষবারের মতো সন্তানের নাম ধরে ডাকছিলেন। প্রিয় মানুষটির মরদেহ ফিরে পেলেও স্বজনদের মধ্যে ছিল না কোনো স্বস্তি। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন মরদেহের দিকে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হলেও শেষ দেখাটা যে এমন হবে, তা মেনে নিতে পারছিলেন না কেউ।

নিহত কলিমউদ্দিনের বাবা বজলুর রহমান বলেন, ‘বিদেশে গেল আমাগো ভাগ্যের চাকা ঘুরাইতে, আর আমরা পাইলাম ওর লাশ! কয়দিন পর পর শুনি আগুনে কত মা-বাপের কোল খালি হয়। ওইখানকার ফ্যাক্টরিতে কোনো নিরাপত্তা আছিল না কেন? আমার ছেলের মতো আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়।’

গণ্ডগোহালী গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এর আগে এতগুলো মরদেহ কখনো দেখিনি। এ ঘটনার পর থেকেই আমাদের গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যে ছেলেগুলো মারা গেল, তারা সবাই পরিবারের উপার্জনের একমাত্র উৎস ছিল। তাদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো আর্থিকভাবেও ভেঙে পড়েছে।’

উদনপৈ গ্রামের নিহত ফরিদের মা সাফিয়া খাতুন বলেন, ‘ছেলেটাই আছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। পেটের টানেই তোরে পাঠাইছিলাম দেশের বাইরে। আগুনে সব শেষ হয়া গেল রে! এখন আমি এই সংসার নিয়া কই যামু? আমার বুকের মানিকরে তো আর কেউ ফিরায়া দিতে পারবো না।’

ডুবাই গ্রামের সোহেল রানার বাবা বাদল তরফদার বলেন, ‘একটা সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় দেশের বাইরে পাঠায়ছিলাম। এখন আমার তো আর কেউ নাই রে বাবা! তোরে বুকে ধইরা কষ্ট কইরা মানুষ করছিলাম। তুই ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কে আছিল? আমার বুড়া বয়সের লাঠিটারে কে কাইড়া নিল রে আল্লাহ।’

গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া নয়জনের মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে। এর মধ্যে সাতজনের বাড়িই নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রশাসনের সহায়তায় রাত দেড়টার দিকে মরদেহগুলো আত্রাইয়ে পৌঁছায়। আজ সকাল সাড়ে ১০টায় উপজেলার মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ মাঠে সাত লাশের একসঙ্গে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলে নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান স্বজনরা। জানাজায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, নওগাঁ জেলা প্রশাসক, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।

এদিকে বাকি ৭ জনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত না হওযায় তাঁদের মরদেহ কবে দেশে ফিরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় স্বজনেরা। আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালী গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি চাখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘কতদিন ধইরা ছেলের মুখটা দেখার জন্য ব্যাকুল হইয়া আছি। হামার ছাওয়ালের লাশ নাকি শনাক্ত হয়নি, এ জন্য পরে আসবে। শেষবার একটু ছোঁয়াও পাব না? সরকারের কাছে আবদার, হামার ছেলের লাশ য্যান দ্রুত নিয়ে আসে।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। এসব সহযোগিতা নিহতদের পরিবারে পৌঁছে দেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, অন্য মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলমান। ডিএনএ মিললেই দ্রুত তাঁদের মরদেহ দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’