ছোটবেলায় বাবা-মায়ের শাসন কিংবা নিয়মকানুন অনেক সময়ই বিরক্তিকর মনে হতো। তখন মনে হতো, কবে যে বড় হব, কবে নিজের মতো করে সব করতে পারব! কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুভূতি বদলে যায়। একসময় হঠাৎ করেই মনে হয়, সেই বকুনি আর আগের মতো শোনা যায় না। বাবা-মা আগের মতো শক্ত হাতে সব সামলান না। বরং বয়সের ভারে ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকেন। আর ঠিক তখনই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কষ্ট কাজ করে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অনুভূতি খুবই স্বাভাবিক। জীবনের একটি পর্যায়ে প্রায় প্রত্যেক মানুষই বাবা-মায়ের বার্ধক্যকে উপলব্ধি করে আবেগাপ্লুত হন। এটি দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং গভীর ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধনেরই বহিঃপ্রকাশ।
কষ্ট লাগে যে কারণে
শৈশব থেকে আমরা বাবা-মাকে এমন মানুষ হিসেবে দেখি, যারা সব সমস্যার সমাধান করতে পারেন। অসুস্থ হলে তারা পাশে থাকেন, ভয় পেলে সাহস দেন, বিপদে রক্ষা করেন। আমাদের কাছে তারা যেন নিরাপত্তার প্রতীক।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষগুলোকেই যখন ধীরে ধীরে বয়সের কারণে দুর্বল হয়ে পড়তে দেখি, তখন সন্তান হিসেবে ভেতরে এক ধরনের অসহায়ত্ব তৈরি হয়। এই পরিবর্তন মেনে নেওয়া অনেকের জন্যই সহজ হয় না।
অ্যামবিগুয়াস লস কী?
মনোবিজ্ঞানে এই অনুভূতির একটি নাম রয়েছে- অ্যামবিগুয়াস লস। অর্থাৎ প্রিয় মানুষটি আমাদের কাছেই আছেন, কিন্তু আগের মতো নেই। তিনি হারিয়ে যাননি, তবুও ধীরে ধীরে বয়স, অসুস্থতা বা শারীরিক পরিবর্তনের কারণে তার পরিচিত রূপ বদলে যেতে থাকে।
এই অবস্থায় মানুষ একসঙ্গে দুঃখ, ভয়, অসহায়ত্ব, অপরাধবোধ এবং এক ধরনের শূন্যতার মধ্যে দিয়ে যায়।অনেকেই ভাবতে থাকেন, ‘আর কতদিন তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারব?’-এই চিন্তাই মনকে ভারী করে তোলে।
নিজের বয়সের কথাও মনে করিয়ে দেয়
বাবা-মায়ের বার্ধক্য শুধু তাদের পরিবর্তনের কথাই মনে করিয়ে দেয় না, এটি আমাদের নিজের সময়ের প্রবাহও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। হঠাৎ করেই বুঝতে পারি, আমরাও আর ছোট নেই। জীবনের দায়িত্ব বেড়েছে, সময় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বাবা-মায়ের বয়স বাড়তে দেখা তাই অনেকের কাছে নিজের জীবনের পরিবর্তনেরও প্রতীক হয়ে ওঠে।
শৈশবের স্মৃতি ও নস্টালজিয়া
বাবা-মায়ের বয়স বাড়তে দেখলে অজান্তেই ফিরে আসে শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি। মনে পড়ে তাদের সঙ্গে কাটানো প্রাণবন্ত দিনগুলো, বকুনি, আদর, হাসি আর নিশ্চিন্ত সময়ের কথা। বর্তমানের সঙ্গে সেই স্মৃতিগুলোর তুলনা করতে গিয়ে অনেকের মনেই এক ধরনের শূন্যতা, নস্টালজিয়া ও বিষণ্ণতা তৈরি হয়। কারণ তখন উপলব্ধি হয়, সময় বদলেছে, মানুষও বদলেছে, আর সেই ফেলে আসা দিনগুলো আর কখনোই ফিরে আসবে না।
এই অনুভূতি স্বাভাবিক
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবা-মায়ের বয়স বাড়তে দেখে মন খারাপ হওয়া কোনো মানসিক দুর্বলতা নয়। বরং এটি প্রমাণ করে, তাদের সঙ্গে আমাদের আবেগের সম্পর্ক কতটা গভীর।
এই অনুভূতিকে অস্বীকার না করে বরং তা গ্রহণ করা জরুরি। যতদিন তারা পাশে আছেন, ততদিন তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, গল্প করা, একসঙ্গে খাওয়া কিংবা ছোট ছোট স্মৃতি তৈরি করা ভবিষ্যতের জন্য অমূল্য হয়ে থাকে।
আরও পড়ুন
কথা কম বলার অভ্যাস মানেই আবেগহীনতা নয়
সময় থাকতেই ভালোবাসা প্রকাশ করুন
জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হলো, সময় কখনো থেমে থাকে না। একসময় যারা আমাদের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, একদিন তাদের হাত ধরেই হয়তো আমাদের হাঁটতে হবে। সম্পর্কের এই পরিবর্তনই জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম।
তাই বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য বিশেষ কোনো দিনের অপেক্ষা করবেন না। একটি ফোনকল, একসঙ্গে এক কাপ চা, একটি আন্তরিক আলিঙ্গন কিংবা কয়েক মিনিটের গল্পও তাদের জন্য অনেক বড় আনন্দ হতে পারে।
আরও পড়ুন
প্রিয়জনের স্পর্শ যেভাবে কমিয়ে দিতে পারে মানসিক কষ্ট
কারণ সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলায়, দায়িত্ব বদলায়, সম্পর্কের ভূমিকাও বদলে যায়। কিন্তু বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি কখনো বদলায় না। যতদিন তারা আছেন, ততদিন তাদের সময় দিন, যত্ন নিন এবং ভালোবাসার কথা বলতে কার্পণ্য করবেন না।
সূত্র: মিডিয়াম, সাইকোলজি টুডে, হেলথশটস
এসএকেওয়াই








