রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি রোববার (১২ জুলাই) ভোরের পর মুষলধারায় রূপ নেয়, যা দুপুর গড়িয়েও থামেনি। এমন বৃষ্টিপাতে পুরান ঢাকার স্বাভাবিক জনজীবন অনেকটাই থমকে যায়। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হননি বেশিরভাগ মানুষ।
লক্ষ্মীবাজার, ইসলামপুর, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি ও আদালতপাড়া ঘুরে দেখা যায়, প্রধান সড়কগুলো তুলনামূলক ফাঁকা। অধিকাংশ দোকানপাটও খুলতে দেরি হয়েছে, কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত ঝাঁপই তোলা হয়নি।
বৃষ্টির কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠনে চলমান অর্ধবার্ষিক ও অন্যান্য পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পুরান ঢাকার বিভিন্ন সরকারি কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক কম।
সড়কে গণপরিবহন না থাকায় রিকশাভাড়া চাওয়া হচ্ছে দ্বিগুণ/ছবি: জাগো নিউজ
পানি জমে স্থবির জনজীবন
সকালে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষের চলাচল খুবই সীমিত। যাদের রাস্তায় পাওয়া গেছে, তাদের বেশিরভাগই খাবার সংগ্রহ, ওষুধ কেনা কিংবা অফিস-আদালতের জরুরি কাজে বের হয়েছিলেন। অনেকেই ছাতা হাতে হাঁটছিলেন, আবার কেউ হাঁটুসমান পানি এড়িয়ে বিকল্প পথ ধরে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন।
সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় পথচারীদের পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও রিকশাচালকদেরও ধীরগতিতে চলাচল করতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও কাদা ও পানি মিশে সৃষ্টি হয়েছে চরম দুর্ভোগ।
আরও পড়ুন
কোমরসমান পানি, নিউমার্কেটে ১০ টাকার ভ্যান সার্ভিস
নিউমার্কেটে হাঁটুপানি, মালামাল বাঁচাতে ব্যস্ত ব্যবসায়ীরা
গ্যাস না থাকায় খাবারের খোঁজে বাইরে
লক্ষ্মীবাজার এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে সকালে লাইনে গ্যাসের চাপ ছিল না। বাসায় রান্না করা সম্ভব হয়নি। তাই বাইরে থেকে খাবার কিনতে বের হয়েছি। কিন্তু রাস্তায় পানি আর কাদার কারণে হাঁটাই কষ্ট হয়ে গেছে। জামাকাপড়ও নষ্ট হয়ে গেলো।’
একই এলাকার রোকসানা বেগম বলেন, ‘বাচ্চাদের জন্য খাবার আনতে বের হতে হয়েছে। এত বৃষ্টিতে বের হতে চাইনি, কিন্তু উপায়ও ছিল না। দোকানও অনেক কম খোলা ছিল।’
লক্ষ্মীবাজার এলাকার একটি রেস্তোঁরার মালিক আবদুল কাদের জানান, বৃষ্টির দিনে সাধারণত রান্না করতে সমস্যা হলে মানুষ হোটেল থেকে খাবার নিয়ে যায়। কিন্তু আজ এত বেশি বৃষ্টি যে মানুষ ঘর থেকেই বের হতে পারছে না। তাই বিক্রিও কম।
বৃষ্টির কারণে সকালে লাইনে গ্যাসের চাপ ছিল না। বাসায় রান্না করা সম্ভব হয়নি। তাই বাইরে থেকে খাবার কিনতে বের হয়েছি। কিন্তু রাস্তায় পানি আর কাদার কারণে হাঁটাই কষ্ট হয়ে গেছে।- লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম
ক্লাস স্থগিত, ফাঁকা ক্যাম্পাস
বৈরী আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে কয়েকটি ক্লাস স্থগিত হয়েছে। তবে লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করার পরিকল্পনা ছিল, তাই এসেছি। আসতে গিয়ে পুরো ভিজে গেছি।’
কবি নজরুল সরকারি কলেজে গিয়ে কথা হয় শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আজ ক্যাম্পাস অনেকটাই ফাঁকা। যারা এসেছে, তাদের বেশিরভাগই জরুরি কাজেই এসেছেন। এমন আবহাওয়ায় বাসা থেকে বের হওয়াটাই কঠিন।’
বাদলা দিনে ফাঁকা পুরান টাকার সড়ক/ছবি: জাগো নিউজ
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের ওপর উপড়ে পড়লো গাছ
টানা বৃষ্টির মধ্যে জবির শান্ত চত্বরে পার্কিং এলাকায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাসের ওপর বড় একটি গাছ ভেঙে পড়েছে। এতে বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে গেলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। খবর পেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গাছটি অপসারণের উদ্যোগ নেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক অধ্যাপক মো. তারিক বিন আতিক জানান, ঘটনায় বাসটির আনুমানিক তিন থেকে চার লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে আরও অনেক ঝুঁকিপূর্ণ গাছ আছে। এগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুন
মিরপুর যেন মিনি কক্সবাজার!
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পে হাঁটুপানি, যাতায়াত পরিহারের আহ্বান
বিপাকে বাদামতলীর ব্যবসায়ীরা
বাদামতলী ফল আড়তের ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বৃষ্টির দিনে ফলের বিক্রি কিছুটা কমে যায়। আবার অধিকাংশ ফল ভিজে গেলে দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেগুলো দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সংস্কারের কাজ চলায় সড়ক কাদা জমে আছে। এতে যেমন ব্যবসায়ীরা দুর্ভোগে পড়েন, তেমনি ক্রেতারাও আড়তে এসে ভোগান্তির শিকার হন, যা বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বৃষ্টির দিনে যাত্রী কম থাকে। সারাদিন ভিজে কাজ করতে হয়। অনেক সময় অসুস্থও হয়ে যাই। তাই একটু বেশি ভাড়া চাইতেই হয়।- রিকশাচালক মো. শহীদুল ইসলাম
সড়কে রিকশার দাপট, বেড়েছে ভাড়া
সড়কে ব্যক্তিগত যানবাহন কম থাকলেও রিকশার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে বৃষ্টির অজুহাতে ভাড়াও ছিল স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি।
লক্ষ্মীবাজার থেকে আদালত এলাকায় যেতে নিয়মিত ভাড়া ২০ থেকে ৩০ টাকা হলেও আজ রিপন হোসেন নামের একজনকে ৫০ টাকার নিচে কোনো রিকশাচালক নিয়ে যেতে রাজি হননি। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এতটুকু পথের জন্য দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হয়েছে। দরাদরি করেও লাভ হয়নি।’
জানতে চাইলে রিকশাচালক মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টির দিনে যাত্রী কম থাকে। সারাদিন ভিজে কাজ করতে হয়। অনেক সময় অসুস্থও হয়ে যাই। তাই একটু বেশি ভাড়া চাইতেই হয়।’
বাহাদুর শাহ পার্ক ফাঁকা থাকলেও সেখানে ফুটবল নিয়ে মেতে উঠে কয়েকজন কিশোর/ছবি: জাগো নিউজ
জনশূন্য বাহাদুর শাহ পার্ক
প্রতিদিন সকালে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সদরঘাটমুখী যাত্রীদের শরীরচর্চা ও বিশ্রামের জায়গা হিসেবে পরিচিত বাহাদুর শাহ পার্কও ছিল প্রায় ফাঁকা। পার্কের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে ছোট ছোট জলাশয়ের মতো দৃশ্য তৈরি হয়েছে।
তবে এর মধ্যেও স্কুলপোশাক পরা কয়েকজন কিশোরকে বৃষ্টির মধ্যেই ফুটবল খেলতে দেখা যায়। চারপাশে টানা বৃষ্টি আর পানিবন্দি পরিবেশেও তাদের উচ্ছ্বাসে ছিল না কোনো ভাটা।
আরও পড়ুন
‘বের না হলে বাজার করার টাকাও থাকবে না, পেট তো আর বৃষ্টি বোঝে না’
৬ বিভাগে অতিভারী বর্ষণের আভাস
আদালতপাড়ায় কম উপস্থিতি
আদালতপাড়ায় বৃষ্টির প্রভাব ছিল স্পষ্ট। জরুরি শুনানির জন্য আইনজীবীরা আদালতে এলেও মামলার কার্যক্রম শেষে অনেককেই ছাতা হাতে বৃষ্টির মধ্যেই চেম্বারের পথে ফিরতে দেখা যায়।
আইনজীবী মাহবুবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আদালতের কাজ থেমে থাকে না। কিন্তু বৃষ্টির কারণে বিচারপ্রার্থী ও সাক্ষীদের উপস্থিতি আজ অনেক কম ছিল।’
বৃষ্টির কারণে আদালতপাড়া ছিল তুলনামূলক ফাঁকা/ছবি: জাগো নিউজ
পুরান ঢাকার বিভিন্ন সরকারি কার্যালয় বিশেষ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়েও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৬টা থেকে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশেই বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আজও দেশের আট বিভাগেই বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। বৃষ্টির প্রবণতা সোমবার (১৩ জুলাই) থেকে কিছুটা কমতে পারে।
এমডিএএ/একিউএফ








