মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টি হলেই ঢাকা মহানগরীর অন্তত ১০৩টি স্পট ডুবে যায়। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করেপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৬৫টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৩৮টি স্পট রয়েছে। এসব জায়গার সড়ক, ফুটপাত ঘণ্টার পর ঘণ্টা তলিয়ে থাকায় নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কি কারণে এই পানি জমছে তা সবার জানা। কি করলে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে, তাও জানা। তারপরও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা ওয়াসা হতে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ৫ বছরের বেশি পার হলেও এ কাজের জন্য স্বতন্ত্র বিভাগ ও জনবল কাঠামো অনুমোদন হয়নি। প্রকৌশল বিভাগের বিদ্যমান জনবল দিয়েই কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে এভাবে সংকটের আশু সমাধান সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্ট অনেকে জানিয়েছেন।

ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ড্রেনেজ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী একেএম সহিদ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা মহানগরবাসীকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে হলে পানি নিষ্কাশন সিস্টেমটাকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য প্রধানত দরকার-আন্তরিকতা, সুপরিকল্পিত উদ্যোগ ও এর বাস্তবায়ন। তবে এতে ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ডিএনসিসির ৬৫ হটস্পট : উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ১, ২, ১০ ও ১১ নাম্বার রোড; উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের ৯, ১০ ও ১১ নাম্বার রোড; ঢাকা-ময়মনসিংহ (বিমানবন্দর) রোড, খিলক্ষেত, ব্যাপারীপাড়া, মধ্যপাড়া, নামাপাড়া, কুড়িল, কালশী রোড, মিরপুর সেকশন-১২ মুসলিম বাজার, মিরপুর-১০ গোলচত্বর, মিরপুর-১১ (প্যারিস), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নাখালপাড়া, শাহীনবাগ, রাওয়া ক্লাবের সামনে, পাগলারপুল, খিলগাঁও শিশুচত্বরসংলগ্ন এলাকা, তেজগাঁও সিদ্দিক মাস্টারের ঢাল, মগবাজারের আমবাগান, মগবাজারের চল্লিশঘর বস্তি, প্রগতি সরণি, বেগম রোকেয়া সরণি, মিরপুর ১ এর কিযাংশি চাইনিজের সামনে, মিরপুর ১ এর দারুসসালাম রোড, টোলারবাগ; মিরপুর রোডের ২৭ নম্বর এলাকা, কাওরান বাজার, বিজয় সরণি, মনিপুরিপাড়া, ফার্মগেট, উলুদাহা-বাদালদি, তারারটেক, পাবনারটেক, কামারপাড়া, ভাটুলিয়া, ধউর, কাওলা, আশকোনা, দক্ষিণখান প্রধান সড়ক, গণ-কবরস্থান রোড, প্রেম বাগান আশকোনা, মধ্য আজমপুর, কাঁচকুড়া হতে ময়নারটেক, আঁটিপাড়া, ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডস্থ বাটাগলি, ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের মেডিকেল রোড ও তালতলা রোড, ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডে আব্দুল্লাহপুর প্রধান সড়ক, ডুমনি বাজার হতে ৩০০ ফুট সংলগ্ন সড়ক, ভাটারা মন্দির রোড, ঢালি বাড়ি রোড, ব্যাপারীবাড়ি রোড, লতিফ খন্দকার রোড, সাতারকুল প্রধান সড়ক, আনন্দ নগর, পশ্চিম পদরদিয়া, পোস্ট অফিস রোড, পূর্বাচল লেন ২২, ২৩, ২৪, ২৫ ও ২৬ এবং বসিলা সড়ক।

ডিএসসিসির ৩৮ হটস্পট : ভারি বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৩৮টি স্পটে। এগুলো হলো-ধানমন্ডি ২৭, গ্রীন রোড, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, নায়েম রোড, ইস্কাটন গার্ডেন রোড, পলাশী এসএম হলের সামনে, সাকুরা মার্কেটের সামনে, মোকাররম ভবনের সামনে, পশ্চিম মালিবাগ, খিলগাঁও ফ্লাইওভার হতে মালিবাগ কমিউনিটি সেন্টার, আনন্দ বেকারি, মানিকনগর টিটিপাড়া পাম্পের সামনে, টিটিপাড়া ট্রাক স্ট্যান্ডের সামনে, মুগদা মেডিকেল কলেজের সামনে, গোপীবাগ বড় মসজিদের সামনে, কমলাপুর রেল স্টেশনের সামনে, শাপলা চত্বরের উত্তর পাশে ফুটওভার ব্রিজের সামনে, নটর ডেম কলেজের সামনে, চারমারির মোড়; সবুজ কানন-১, ২ ও ৩ নম্বর গলি; মালিবাগ প্রথম লেন, শান্তিবাগ ১৭ নম্বর গলি, পল্টন, দৈনিক বাংলা, ফকিরেরপুল, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সামনের এলাকা, বুয়েট কোয়ার্টারসংলগ্ন এলাকা, আগাসাদেক রোড, মাজেদ সরদার রোড, অভয়দাস লেন, আলমবাগ, পশ্চিম জুরাইন, মুন্সিবাড়ি পাইপ রোড, সায়েদাবাদ টার্মিনালের দক্ষিণ পাশের সড়ক ও জিয়া সরণি।

জলাবদ্ধতার কারণ : সংশ্লিষ্টদের মতে, জলাবদ্ধতার উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো- ১. সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু না হওয়া ২. পানি ধারণের জায়গা ভরাট ৩. পানি নিষ্কাশন চ্যানেল দখল ও ভরাট ৪. খালকে বক্স কালভার্ট করায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত ৫. পানি নিষ্কাশনে সিটি করপোরেশনের অদক্ষতা এবং জনবলের অভাব ৬. ঢাকার পাশ্বর্বর্তী এলাকার পানি ধারণ এলাকা কমে যাওয়া ৭. পানি নিষ্কাশনে অপর্যাপ্ত আউটলেট ৭. ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় বর্ষার মৌসুমে বৃষ্টির পানি বের হতে না পারা ৮. পানি নিষ্কাশন ড্রেন ও চ্যানেলগুলো আবর্জনায় ভরে যাওয়া ৯. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হওয়া।

প্রতিকারের উপায় : বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া দরকার। সেগুলো হলো-১. ঢাকা ওয়াসা প্রণীত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬ কে যাচাই-বাছাই করে বাস্তবায়ন করা ২. ক্যাচপিট, ড্রেন, চ্যানেল হয়ে পানি পাম্প স্টেশন পর্যন্ত নির্বিঘ্নে যাওয়ার ব্যবস্থা করা ২. পাম্প স্টেশনের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো ৩. দুই সিটির পানি নিষ্কাশনের স্বতন্ত্র বিভাগ ও দক্ষজনবল তৈরি ৪. হটস্পট চিহ্নিত করে সেসবের সমাধান করা ৫. ড্রেনেজ রক্ষণাবেক্ষণ করা ৬. ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ৭. স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম গড়ে তোলা।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাবিকুল ইসলাম হাসান যুগান্তরকে বলেন, নগরবাসীই পানি নিষ্কাশন চ্যানেল, ড্রেন, জলাশয় দখল ও ভরাট করছে। যা পরিষ্কার করতে সিটি করপোরেশন হিমশিম খাচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পয়োবর্জ্য সংযোগ লাইন পানি নিষ্কাশন ড্রেনের সঙ্গে-এজন্য ড্রেন ভরাট হয়ে যায়। এছাড়া খেয়াল-খুশিমতো আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। তবে এসব সামাল দিয়ে জলাবদ্ধতার টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করে কাজ অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. বোরহান উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতার সমাধান করতে হলে ক্যাচপিট, ড্রেন, পাম্পিং স্টেশন বাড়ানোর পাশাপাশি আশপাশের নদ-নদী পরিষ্কার করে ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ডিএসসিসি এলাকায় যে সংখ্যক পাম্পিং স্টেশন রয়েছে, তা চাহিদার তুলনায় কম। এজন্য পাম্পিং স্টেশনের সংখ্যা বাড়াতে হবে।