এই বর্ষায় যদি চা পান করতে করতে চা বাগান দেখতে চান, তাহলে ঘুরে আসতে পারেন চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল থেকে। কেননা বছরে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় শ্রীমঙ্গলে। বৃষ্টির সাথে সাথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কয়েকগুণ বেড়ে যায় এ জনপদের। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় মাটি তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা হারায়। এতে চা গাছগুলো শুকিয়ে যায়। পাতাগুলো লাল রঙের হয়ে মরে যায়। যখন বর্ষা মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি হয়; তখন চা গাছগুলো সজীব হয়ে নতুন করে দুটি পাতা ও একটি কুড়ি ফুটিয়ে তোলে। এই সবুজ পাতা আকৃষ্ট করে ভ্রমণপিপাসুদের। তাই বর্ষা মৌসুম চা বাগান ভ্রমণের সঠিক সময়।
বাংলাদেশের মোট ১৬৮টি চা বাগানের মধ্যে মৌলভীবাজারে ৯৩টি চা বাগান আছে। জেলার ৭টি উপজেলার প্রত্যেকটিতে চা বাগান আছে। সবচেয়ে বেশি ৪০টি চা বাগান হলো শ্রীমঙ্গল উপজেলায়, এরপর ২২টি কমলগঞ্জে। এ জন্য এ জেলাকে বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী বলা হয়। জেলার প্রতিটি চা বাগান দৃষ্টিনন্দন। অনেক চা বাগানের ভেতরে আছে জলমগ্ন লেক। এসব লেক চা বাগানের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বর্ষায় চা বাগানের মেঠোপথ ও সবুজ দৃশ্য অন্যরকম পরিবেশে নিয়ে যায় পর্যটকদের। এ ছাড়া জেলার ৯৩টি চা বাগানে প্রায় ৮০টি চা কারখানা আছে। এসব কারখানায় বর্ষা মৌসুমে ২৪ ঘণ্টা চা উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়।

জানা যায়, ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগান দিয়ে বাংলাদেশে চা শিল্পের গোড়াপত্তন হয়। এর বাণিজ্যিক রূপ ধারণ করে ১৮৫৭ সালে। সিলেট বা চট্টগ্রামে চায়ের জন্ম হলেও এর সবচেয়ে বেশি বিস্তার ঘটে মৌলভীবাজার জেলায়। চায়ের রাজধানীকে সমৃদ্ধ করেছে উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরাতন চা গবেষণা কেন্দ্র। এটি শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অবস্থিত। এ অঞ্চলের চা শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য পাকিস্তান চা বোর্ড ১৯৫৭ সালে একটি চা গবেষণা স্টেশন প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (বিটিআরআই) প্রধান কার্যালয় হিসেবে উন্নীত করে। যা দেখতে সারাবছর প্রচুর পর্যটক এলেও বর্ষায় এর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন
ঘুরে আসুন সামরাজ ঘাটের মাছের রাজ্য থেকে
স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, চায়ের রাজ্যে আকর্ষণ হিসেবে জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় আছে এক কাপে সাত রঙের চা। এই চায়ের স্বাদ নিতে দেশি-বিদেশি চাপ্রেমী পর্যটকেরা ছুটে আসেন। সাতটি স্তরের প্রতিটি স্তরের আলাদা আলাদা স্বাদ এবং রং আছে। এই সাত রঙের চা নীলকণ্ঠ টি কেবিনে পাওয়া যায়। রমেশ রাম গৌড় হচ্ছেন এই সাত রং চায়ের উদ্ভাবক।
নরসিংদী থেকে ঘুরতে আসা জালাল আহমেদ ও সাকিব চৌধুরী বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর বর্ষায় ঘুরতে আসি শ্রীমঙ্গলে। বর্ষায় চা বাগানে ঘুরতে এলে চা বাগানের পাশাপাশি কারখানাগুলোতে কীভাবে চা উৎপাদন ও প্রক্রিয়া করা হয়, তা দেখা যায়। এ ছাড়া চা পান করতে করতে বৃষ্টি হলে বৃষ্টিভেজা চা পাতা দেখা যায়।’

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমেদ বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে মৌলভীবাজারে সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশি পর্যটক আসেন। এখানে বর্ষায় প্রকৃতির রূপ চমৎকার হয়। অনেক পর্যটক শুধু রিসোর্টে থাকার জন্য আসেন, যাতে বৃষ্টি দেখে চা পান করতে পারেন।’
আরও পড়ুন
বর্ষায় ঘুরে আসুন বৃষ্টিভেজা গারো পাহাড়ে
গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান বলেন, ‘মৌলভীবাজারের পর্যটন শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে। বিশেষ করে সরকারিভাবে একটা জাদুঘরের প্রয়োজন। তাহলে আরও পর্যটক আসবেন। এখানকার প্রাণপ্রকৃতি অনেক চমৎকার। বর্ষায় এর সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে চা বাগানগুলো দেখতে অনেক সুন্দর লাগে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল জোনের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলে সারাবছর পর্যটক আসেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সৌখিন পর্যটকেরা আসেন। এই সময়ে প্রকৃতির আসল রূপ দেখা যায়। যেদিকে তাকানো যায়; সেদিকে সজীবতা চোখে পড়বে। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য ট্যুরিস্ট পুলিশ সব সময় কাজে নিয়োজিত।’

যেভাবে যাবেন
ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে রেলপথে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ, শমশেরনগর ও কুলাউড়া রেল স্টেশনে নেমে সহজেই সিএনজি অটোরিকশা বা রিকশা বা হেঁটে চা বাগান দেখা যায়। বাসে দেশের যে কোনো জায়গা থেকে সরাসরি শ্রীমঙ্গল বা মৌলভীবাজার শহরে নেমে লোকাল বাস, সিএনজি অটোরিকশা বা হেঁটে চা বাগানে যাওয়া যাবে।
আরও পড়ুন
কানাডার টরন্টো শহরের বুকে আরেক বাংলাদেশ
এমএআইএস/এসইউ








