লোহা, তামা কিংবা রুপার মতো অনেক ধাতুই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অক্সিডেশনের কারণে মরচে ধরে বা উজ্জ্বলতা হারায়। কিন্তু সোনা বছরের পর বছর একই রকম চকচকে থাকে। এমনকি শতাব্দীর পর শতাব্দী মাটির নিচে চাপা থাকলেও এর জেল্লা খুব একটা নষ্ট হয় না। দীর্ঘদিনের এই প্রশ্নের নতুন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।

তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স সাময়িকীতে। গবেষণায় উঠে এসেছে, সোনার পৃষ্ঠে থাকা পরমাণুগুলোর বিশেষ আচরণই তাকে মরচে পড়া থেকে রক্ষা করে।

সাধারণভাবে কোনও ধাতুর সংস্পর্শে বাতাসের অক্সিজেন এলে অক্সিডেশন বা জারণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের দুই পরমাণুর অণু প্রথমে ভেঙে পৃথক পরমাণুতে পরিণত হয়। পরে সেই পরমাণুগুলো ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে অক্সাইডের স্তর তৈরি করে, যাকে আমরা মরচে হিসেবে চিনি। কিন্তু সোনার ক্ষেত্রে এই ধাপটি কার্যত ব্যর্থ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

সোনার দাম ফের ৫ হাজার ডলার ছাড়াতে পারে এ বছরেই

গবেষক সান্তু বিশ্বাস ও ম্যাথিউ মন্টেমোর দেখিয়েছেন, সোনা অক্সিজেনের অণুকে ভেঙে পৃথক পরমাণুতে পরিণত হওয়ার সুযোগই প্রায় দেয় না। ফলে অক্সিডেশন শুরু হওয়ার আগেই প্রক্রিয়াটি থেমে যায়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাতাসের সংস্পর্শে আসার পর সোনার ওপরের স্তরের পরমাণুগুলো খুব দ্রুত নিজেদের বিন্যাস বদলে ফেলে। সাধারণ বর্গাকার গঠন থেকে তারা হেক্সাগোনাল বা ষড়ভুজাকার বিন্যাসে রূপ নেয়। এই নতুন পারমাণবিক কাঠামো অক্সিজেনের অণু ভাঙার জন্য অত্যন্ত অনুপযোগী, ফলে জারণের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নেমে আসে।

why gold does not rust: জানেন সোনায় কেন মরচে পড়ে না?

বিজ্ঞানীদের হিসাব বলছে, যদি সোনার পরমাণুগুলো এই স্বাভাবিক বিন্যাস পরিবর্তনের ক্ষমতা না রাখত, তাহলে সোনাও অন্যান্য সাধারণ ধাতুর মতো বাতাসে উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অক্সিডেশনের শিকার হতো এবং তার স্বাভাবিক সোনালি আভা হারিয়ে ফেলত। এ কারণেই হাজার বছর ধরে মাটির নিচে থাকা সোনার অলংকার বা নিদর্শন উদ্ধার করার পরও সেগুলো প্রায় নতুনের মতোই উজ্জ্বল দেখা যায়।

তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, বিশেষ কিছু পরীক্ষাগারভিত্তিক কৃত্রিম পরিবেশ বা চরম রাসায়নিক অবস্থায় সোনা অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সোনা অক্সাইড তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই যৌগ অত্যন্ত অস্থিতিশীল হওয়ায় তা স্থায়ী হয় না। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই অক্সাইড স্তর ভেঙে যায়, ফলে সোনার ওপর দীর্ঘস্থায়ী কোনও মরচে তৈরি হয় না।

আরও পড়ুন

সোনার দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আজ কত?

গবেষক ম্যাথিউ মন্টেমোরের মতে, সোনার পরমাণুর এই ক্ষুদ্র বিন্যাস পরিবর্তন অক্সিডেশনের গতি এক বিলিয়ন থেকে এক ট্রিলিয়ন গুণ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে সক্ষম। অর্থাৎ চোখে দেখা যায় না এমন সূক্ষ্ম পারমাণবিক পরিবর্তনই সোনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে স্থিতিশীল ও টেকসই ধাতুগুলোর একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এই আবিষ্কার শুধু সোনার মরচে না ধরার কারণ ব্যাখ্যা করেই থেমে থাকবে না। সোনার এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আরও উন্নত ও কার্যকর অনুঘটক (ক্যাটালিস্ট) তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে রাসায়নিক বিক্রিয়াকে আরও দ্রুত, দক্ষ ও কম খরচে পরিচালনার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

আরও পড়ুন

আজ যে দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা-রুপার গহনা

জেএস/