প্রোটিন শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। পেশি গঠন, কোষ মেরামত, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখা থেকে শুরু করে শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। তবে বর্তমানে মাংসের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকের পক্ষে নিয়মিত মাংস খাওয়া সম্ভব হয় না।
আবার হৃদ্রোগ, উচ্চ কোলেস্টেরল বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শে লাল মাংস এড়িয়ে চলেন। তাই প্রশ্ন ওঠে-মাংস না খেলে কি শরীরের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব?
পুষ্টিবিদদের মতে, অবশ্যই সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে এমন অনেক সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য খাবার রয়েছে, যেগুলো নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলে শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিন সহজেই পাওয়া যায়। পাশাপাশি এসব খাবারে থাকে ফাইবার, ভিটামিন, খনিজ ও স্বাস্থ্যকর চর্বি, যা সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখুন প্রাকৃতিক প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
শিম ও ডালজাতীয় খাবার
প্রোটিনের সবচেয়ে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে শিম, মটর, ছোলা, মসুর, মুগ ও বিভিন্ন ধরনের ডাল। এসব খাবারকে একত্রে বলা হয় লেগিউম।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি কেজি ওজনের জন্য দৈনিক প্রায় ০.৮ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। অর্থাৎ ৬৮ কেজি ওজনের একজন মানুষের দিনে প্রায় ৫৪ গ্রাম প্রোটিন দরকার হয়।
রান্না করা আধা কাপ মসুর ডাল থেকেই প্রায় ৯ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি ডালজাতীয় খাবারে থাকে খাদ্যআঁশ, আয়রন, পটাশিয়াম, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ডাল খেলে হৃদ্রোগ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমতেও সাহায্য করতে পারে।
কম খরচেও মিলতে পারে পর্যাপ্ত প্রোটিন
ডিম থেকে
ডিমকে প্রায়ই সুপার ফুড বলা হয়। কারণ এতে শরীরের প্রয়োজনীয় প্রায় সব অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে।
একটি মাঝারি আকারের ডিমে প্রায় ৬ গ্রাম প্রোটিন এবং প্রায় ৭০ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। পাশাপাশি এতে রয়েছে ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি, রিবোফ্লাভিন, কোলিন ও সেলেনিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান।
সকালের নাস্তা, দুপুরের তরকারি কিংবা রাতের খাবারের খাদ্যতালিকায় যোগ করা যায়। যারা মাংস কম খান, তাদের জন্য ডিম হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প।
মাছ স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস
মাংসের তুলনায় অনেক ধরনের মাছ তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস। বিশেষ করে তেলাপিয়া, রুই, কাতলা কিংবা বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ থেকে সহজেই উচ্চমানের প্রোটিন পাওয়া যায়। ১০০ গ্রাম তেলাপিয়া মাছে প্রায় ২৩ থেকে ২৭ গ্রাম প্রোটিন থাকে, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক চাহিদার প্রায় অর্ধেক পূরণ করতে পারে।
এছাড়া মাছে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন বি১২, নিয়াসিন, ফসফরাস ও সেলেনিয়াম। বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত মাছ খাওয়ার পরামর্শ দেন, কারণ এটি হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
দুগ্ধজাত খাবারে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
কম চর্বিযুক্ত দুধ, টক দই কিংবা গ্রিক ইয়োগার্টও প্রোটিনের ভালো উৎস। এক কাপ কম ফ্যাটযুক্ত দুধে প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিন থাকে। অন্যদিকে এক কাপ টক দই থেকে প্রায় ১৮ গ্রাম পর্যন্ত প্রোটিন পাওয়া যেতে পারে।
দুধ ও দইয়ের বিশেষ সুবিধা হলো, এগুলোতে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও ফসফরাসও থাকে। ফলে হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নির্দিষ্ট সময়ে খাবার না খেলে শরীরে যেসব সমস্যা দেখা দেয়
চিনাবাদাম ও বিভিন্ন বীজ
অনেক দামি বাদাম সবার নাগালের মধ্যে না থাকলেও চিনাবাদাম খুব সহজেই পাওয়া যায় এবং এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর। প্রতি ১০০ গ্রাম চিনাবাদামে প্রায় ২৫ গ্রাম প্রোটিন থাকে। পাশাপাশি এতে রয়েছে স্বাস্থ্যকর চর্বি, খাদ্যআঁশ, ভিটামিন ই, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস ও ফোলেট।
এছাড়া তিল, কুমড়োর বীজ, সূর্যমুখীর বীজ ও চিয়া সিডেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রোটিন পাওয়া যায়। এসব খাবার হজমশক্তি উন্নত করতে, রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক।
আরও পড়ুন
লাল নাকি সাদা কোন ডিমে পুষ্টি বেশি
শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডাল, ডিম, মাছ, দুধ, দই, বাদাম ও বিভিন্ন বীজের সমন্বয় রাখলে শরীর সহজেই প্রয়োজনীয় প্রোটিন পেতে পারে। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য ও নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম যোগ হলে স্বাস্থ্য আরও ভালো থাকে।
অর্থাৎ প্রোটিনের জন্য শুধু মাংসই একমাত্র ভরসা নয়। সঠিক পরিকল্পনায় খাদ্যতালিকা সাজালে কম খরচেও শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিনের চাহিদা সহজেই পূরণ করা সম্ভব।
সূত্র: হেলথলাইন, বিবিসি, আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন
এসএকেওয়াই








