অনেকেই লক্ষ্য করেছেন, দুপুরে এক প্লেট ভাত খাওয়ার পর চোখে ঘুম নেমে আসে। অফিসে, বাসায় কিংবা ছুটির দিনে-ভাত খাওয়ার কিছুক্ষণ পরই শরীর যেন বিশ্রাম চাইতে শুরু করে। অনেকের ধারণা, এর কারণ শুধু ভাত। কিন্তু সত্যিই কি ভাতই ঘুমের জন্য দায়ী? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

ভাত খাওয়ার পর কেন ঘুম পায়?

ভাতে থাকে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট। কার্বোহাইড্রেট শরীরে প্রবেশ করার পর তা গ্লুকোজে পরিণত হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা সাময়িকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এই বাড়তি শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে শরীর থেকে ইনসুলিন হরমোন নিঃসৃত হয়।

আরও পড়ুন

মর্নিং সিকনেসে ভুগছেন? স্বস্তি মিলবে এই উপায়ে

ইনসুলিনের কারণে শরীরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা মস্তিষ্কে ট্রিপটোফ্যান নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রবেশ সহজ করে। ট্রিপটোফ্যান থেকে তৈরি হয় সেরোটোনিন এবং পরে মেলাটোনিন, যা শরীরকে শান্ত করে এবং ঘুমের অনুভূতি তৈরি করতে সাহায্য করে।

শুধু ভাত নয়, বেশি খাওয়াও একটি কারণ

অনেকে মনে করেন, শুধু ভাত খেলেই ঘুম আসে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। যদি আপনি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরিমাণে খাবার খান, তাহলে শরীরের পরিপাকতন্ত্রকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। হজমের সময় পাকস্থলী ও অন্ত্রে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়। ফলে মস্তিষ্কে তুলনামূলকভাবে কম রক্তপ্রবাহ অনুভূত হতে পারে, যার কারণে কিছু মানুষের শরীরে ক্লান্তি ও তন্দ্রাভাব দেখা দেয়।

দুপুরে ঘুম বেশি পায় কেন?

মানুষের শরীরে একটি প্রাকৃতিক জৈবিক ঘড়ি কাজ করে। সাধারণত দুপুর ১টা থেকে ৩টার মধ্যে আমাদের সতর্কতা কিছুটা কমে যায়। এই সময় যদি ভারী খাবার খাওয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ঘুমের প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। অর্থাৎ, দুপুরের খাবার এবং শরীরের প্রাকৃতিক ছন্দ-দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে ঘুম বেশি অনুভূত হয়।

আরও পড়ুন

থাইরয়েড সমস্যার সাধারণ উপসর্গগুলো জানেন তো?

সাদা ভাতের প্রভাব বেশি হতে পারে

সাদা চালের ভাতের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে এটি দ্রুত হজম হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়াতে পারে। এর ফলে ইনসুলিনও দ্রুত নিঃসৃত হয়, যা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে তন্দ্রাভাব বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে লাল চাল, ব্রাউন রাইস বা আঁশযুক্ত খাবার ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায়। তাই এগুলো খেলে অনেকের ক্ষেত্রে ঘুম কম পেতে পারে।

ভাতের সঙ্গে কী খাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ

ভাতের সঙ্গে যদি বেশি তেল-চর্বিযুক্ত, ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার খাওয়া হয়, তাহলে হজমে আরও বেশি সময় লাগে এবং শরীরে অলসতা বাড়তে পারে। অন্যদিকে ভাতের সঙ্গে যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে ডাল, মাছ বা মুরগি, শাকসবজি, সালাদ থাকে, তাহলে খাবারটি সুষম হয় এবং অতিরিক্ত তন্দ্রাভাব কিছুটা কমতে পারে।

আরও পড়ুন

ডেলিভারির আগেই হসপিটাল ব্যাগ গুছিয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন

ভাত খাওয়ার পর ঘুম এড়াতে কী করবেন?

  • একবারে অতিরিক্ত ভাত না খেয়ে পরিমিত পরিমাণে খান।
  • ভাতের সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও শাকসবজি রাখুন।
  • খাবারের পর ৫-১০ মিনিট ধীরে হাঁটুন।
  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
  • রাতে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন, কারণ ঘুমের ঘাটতি থাকলে দুপুরে তন্দ্রাভাব আরও বাড়ে।

ভাত খেলে কি সবসময় ঘুম আসবে?

না। এটি ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারও বিপাকক্রিয়া দ্রুত, কারও ধীর। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের মান, এমনকি ডায়াবেটিসের মতো শারীরিক অবস্থাও খাবারের পর ঘুমের অনুভূতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

আরও পড়ুন

খালি পেটে অলিভ অয়েল খাওয়ার আগে সতর্ক হোন

ভাত খাওয়ার পর ঘুম আসা একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া। এর জন্য শুধু ভাতকে দায়ী করা ঠিক নয়। বরং কার্বোহাইড্রেট, ইনসুলিনের কার্যক্রম, শরীরের জৈবিক ঘড়ি, খাবারের পরিমাণ এবং জীবনযাত্রার অভ্যাস-সবকিছু মিলিয়েই এই তন্দ্রাভাব তৈরি হয়। তাই পরিমিত ও সুষম খাবার খাওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করলে ভাত খাওয়ার পর অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।

তথ্যসূত্র: টিভিনাইন

জেএস/