ফার্মেসির তাকে সাজানো হাজারো পণ্যের ভিড়ে লেবেল দেখে আমরা অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। কোথাও লেখা এসপিএফ ১৫, কোথাও ৩০ বা ৫০+, ব্রড স্পেকট্রাম, ওয়াটার-রেজিস্ট্যান্ট কিংবা ‘রিফ-সেফ’। কিন্তু ত্বক সুরক্ষার পাশাপাশি এই সানস্ক্রিনগুলো আমাদের পরিবেশ, সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য এবং প্রাণিকুলের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা ভাবা সমান জরুরি। অনেকে হয়তো জানেন না, আধুনিক সানস্ক্রিনের ব্যবহার ১৯৭০-এর দশক থেকে শুরু হয়। বর্তমান বিজ্ঞান বলছে আমাদের ব্যবহৃত সাধারণ সানস্ক্রিন সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি না করে কীভাবে কার্যকর ও প্রাণিবান্ধব সানস্ক্রিন বেছে নেবেন জানেন?
প্রাকৃতিক বা অরগানিক লেবেল থাকলেই কোনো সানস্ক্রিন ‘ক্রুয়েল্টি-ফ্রি’ বা ভেগান হয়ে যায় না। সানস্ক্রিনে এমন কিছু লুকানো উপাদান থাকে, যা প্রাণিজ উৎস থেকে আসে। কেনা এড়াতে তিনটির মূল উপাদান ও তার বিকল্প চিনে নিন।
বিউক্সওয়াক্স: টক্সিনমুক্ত ও মসৃণ টেক্সচারের জন্য এটি ব্যবহৃত হলেও বাণিজ্যিক মৌমাছি পালনের প্রক্রিয়া মৌচাকের ক্ষতি করে। এর বিকল্প হিসেবে উদ্ভিজ্জ ‘ক্যান্ডেলিলা ওয়াক্স’ (Candelilla wax) বা কোকো বাটারসমৃদ্ধ সানস্ক্রিন বেছে নেওয়া উচিত।
মধু: আর্দ্রতা ধরে রাখতে এটি ব্যবহৃত হলেও মৌমাছিকে শোষণ করে তা সংগ্রহ করা হয়। এর বদলে নারকেল তেল, শিয়া বাটার বা জোজোবা তেলযুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করা যায়।
স্টিয়ারিক অ্যাসিড: এটি সানস্ক্রিনকে ত্বকে সাদা স্তর পড়া ছাড়াই মিশে যেতে সাহায্য করে। তবে এটি গরু বা শূকরের চর্বি থেকে আসতে পারে। আবার পাম বা নারকেল তেল থেকেও আসতে পারে। তাই নিশ্চিত হতে থার্ড-পার্টি ‘সার্টিফায়েড ভেগান’ লেবেল দেখে পণ্য কেনা উচিত।
এসপিএফ মূলত ‘সান প্রোটেকশন ফ্যাক্টর’। সানস্ক্রিন ছাড়া ত্বক যতটুকু সময়ে পুড়ত, এটি ব্যবহারে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সময় ত্বক সুরক্ষিত থাকবে। ডার্মাটোলজিস্টদের মতে, মানুষের ত্বকের ৬টি ফোটো টাইপ বা ধরন রয়েছে—
ফোটো টাইপ ১ ও ২: ফরসা ত্বক, সোনালি বা লাল চুল এবং উজ্জ্বল চোখ। এদের ত্বক খুব দ্রুত পুড়ে যায়, কিন্তু ট্যান হয় না। এদের জন্য এসপিএফ ৫০+ ব্যবহার বাধ্যতামূলক।
ফোটো টাইপ ৩ ও ৪: মাঝারি বা অলিভ স্কিন টোন। এরা ধীরে ধীরে ট্যান হয় এবং সহজে পোড়ে না। এদের জন্য এসপিএফ ২০ থেকে ৩০ উপযোগী।
ফোটো টাইপ ৫ ও ৬: গাঢ় বাদামি বা কালো ত্বক। মেলানিনের আধিক্যের কারণে এদের ত্বক চরম আবহাওয়া ছাড়া পোড়ে না। এদের জন্য সাধারণত এসপিএফ ৬ থেকে ১৫ যথেষ্ট।
জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ক্রান্তীয় বা ট্রপিক্যাল সাগরগুলোতে ৬ হাজার থেকে ১৪ হাজার টন সানস্ক্রিন গিয়ে মেশে। এর বেশির ভাগই জমা হয় প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল রিফে। রাসায়নিক সানস্ক্রিনে থাকা ‘অক্সিবেনজোন’ এবং ‘অক্টিনোক্সেট’-এর মতো উপাদানগুলো কোরাল বা সামুদ্রিক অ্যানিমোনের শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক বিষাক্ত উপাদানে পরিণত হয়। এটি প্রবালের ডিএনএ নষ্ট করে, তাদের প্রজনন ব্যাহত করে এবং কোরাল ব্লিচিং বা প্রবাল সাদা করে মৃত পাথরে পরিণত করে। স্পেনের ‘ইউনিভার্সিটি অব কান্তাব্রিয়া’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, সৈকতে অতিরিক্ত পর্যটকের উপস্থিতির কারণে সেখানকার সাগরের পানিতে টাইটানিয়ামের মাত্রা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
—জিংক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইডসমৃদ্ধ খনিজ সানস্ক্রিন বেছে নিন।
—প্রবাল বা সামুদ্রিক প্রাণী যেন উপাদানগুলো গিলে না ফেলে, সে জন্য ১০০ ন্যানোমিটারের চেয়ে বড় কণার ‘নন-ন্যানো’ সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।
—পরিবেশের সঙ্গে সহজে মিশে যায়—এমন বায়োডিগ্রেডেবল ফরমুলেশন বেছে নিন।
—স্প্রে বা অ্যারোসল সানস্ক্রিনে ক্ষতিকর ‘বেনজিন’ থাকে, যা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকতে পারে এবং এটি অত্যন্ত দাহ্য। এ ছাড়া সিলিকন পরিবেশের ক্ষতি করে বিধায় সিলিকনমুক্ত পণ্য বেছে নিন।
—যেসব প্লাস্টিক কণা ভাঙতে শত বছর সময় নেয়, সেই মাইক্রোপ্লাস্টিক মুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।
—পরিবেশবান্ধব হলেও সেটি যেন অবশ্যই সূর্যের ইউভিএ ও ইউভিবি উভয় রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেয়।
—যেসব পণ্যের উপাদানের তালিকা স্পষ্ট ও ছোট, সেগুলো কিনুন।
—পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা রিফিল অপশনযুক্ত পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের সানস্ক্রিনকে অগ্রাধিকার দিন।
—অনেক দেশ প্রবালের ক্ষতি করে—এমন রাসায়নিক নিষিদ্ধ করেছে। তাই স্থানীয় নিয়ম মেনে তৈরি রিফ-সেফ সানস্ক্রিন কিনুন।
বেলা ১১টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত তীব্র রোদ এড়িয়ে চলুন। সানস্ক্রিন ব্যবহারের পাশাপাশি চওড়া হ্যাট, ইউভি প্রোটেক্টিভ সানগ্লাস এবং হালকা সুতি কাপড়ের পোশাক পরিধান করুন। প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর এবং সাঁতার কাটার পর সানস্ক্রিন পুনরায় ব্যবহার করুন এবং এক বছরের বেশি পুরোনো সানস্ক্রিন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র ডার্মাটোলজিস্টরা সিডিসির জাতীয় সমীক্ষার ডেটা বিশ্লেষণ করে একটি চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন। তাঁরা দেখেন, যাঁরা শুধু সানস্ক্রিনের ওপর নির্ভর করে রোদে থাকেন, তাঁদের ত্বক বেশি পুড়ে যায়। কারণ সানস্ক্রিন একটি মিথ্যা নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়, ফলে মানুষ দীর্ঘ সময় রোদে কাটায় এবং বারবার সানস্ক্রিন লাগাতে ভুলে যায়। এফডিএ এবং ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসারের মতে, শুধু সানস্ক্রিন একাই স্কিন ক্যানসার কমাতে পারে না।
সূত্র: মিডিয়াম, গ্রিন পিপল








