শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আজ ২৯ জুন রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। আপাদমস্তক শিল্পী মানুষটি মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার ২০১২ আজীবন সম্মাননা পেলে তাঁকে নিয়ে সে বছরই ২৮ এপ্রিল মূল রচনা প্রকাশ করেছিল প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো।
‘তোমাদের ঢাকা টেলিভিশনে একটা নাটক দেখেছিলাম, অসাধারণ! রক্তকরবী, কে করেছেন?’—এই প্রশ্নটি কার, তা অনুমান করতে পারছেন?
সত্যজিৎ রায়। যাঁকে প্রশ্নটি করেছেন তাঁর উত্তর: ‘মুস্তাফা মনোয়ার, আপনার কাজের একনিষ্ঠ ভক্ত।’
‘ও, ওনার নাম শুনেছি, ভালো জলরঙে ছবি আঁকেন’—সত্যজিতের জবাব।
প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ১৯৮৫ সালে যখন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, তখন এমন কথোপকথন হয়েছিল দুজনের মধ্যে। (চলচ্চিত্রযাত্রা, তারেক মাসুদ, প্রথমা প্রকাশন)।
২.
রক্তকরবীর মতো ‘অসাধারণ’ টিভি নাটকের নির্মাতা, জলরঙে ‘ভালো’ ছবি আঁকিয়ে—সত্যজিতের এই প্রশংসা তারেক মাসুদের কাছ থেকে শোনার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীকে ডেকে বলেছিলেন, ‘এই শুনেছ, আমার তো নোবেল পাওয়া হয়ে গেছে।’ সত্যজিৎ রায় আসলে তাঁর মাত্র শুধু দুটো গুণের কথা জেনেছিলেন!

চিত্রকলায় ডিগ্রিধারী মুস্তাফা মনোয়ার একজন সংগীত পারদর্শী মানুষ, হিজ মাস্টার্স ভয়েসে প্রতিযোগিতা করে একবার সেরা গায়কও নির্বাচিত হয়েছিলেন। মঞ্চে নাটকের নির্দেশনা, সংগীত পরিচালনা, নৃত্য পরিচালনা—নিয়মিতই করে গেছেন তিনি। শিক্ষকতা করেছেন আর্ট কলেজে, কাজ করেছেন টেলিভিশন মাধ্যমে, সেখানে সৃজনশীল কাজ যেমন করেছেন, তেমনি করেছেন ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাজও। শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট ও এফডিসির মতো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে (২০১২) তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর চেয়ারম্যান।
বাংলাদেশে পাপেট বলতে আজ যা বোঝায়, তার শুরু ও এখন যে পর্যায়ে এসেছে, তার একক কৃতিত্ব আর কারও নয়, মুস্তাফা মনোয়ারের। দ্বিতীয় সাফ গেমসের ‘মিশুক’, ষষ্ঠ সাফ গেমসের ‘অদম্য’, একাদশ সাফ গেমসের দোয়েল ‘কুটুম’ কার স্মৃতি থেকে মুছে গেছে! আজকের ‘মীনা’ কার্টুন বা বাংলাদেশে ‘সিসিমপুরের’ মতো অনুষ্ঠানের পেছনে তাঁর অবদানকে কে অস্বীকার করবে!
৩.
ঝিনাইদহ জেলার মনোহরপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া মুস্তাফা মনোয়ারের শিক্ষার শুরু কলকাতায়, সেখানকার শিশু বিদ্যাপীঠে। অল্প বয়সে মাকে হারিয়েছেন। পিতা কবি গোলাম মোস্তফার স্কুলশিক্ষকের চাকরির সুবাদে তাঁর সঙ্গে থাকতে হয়েছে নানা জায়গায়। কিন্তু নিজের গ্রাম কখনো তাঁর স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। ‘একদম ছোটবেলা গ্রামে ছিলাম। তবে কলকাতা থেকে নিয়মিত গ্রামে যেতাম। গ্রামের খোলা মাঠ নদী—এগুলো সব সময়েই আমার অসম্ভব ভালো লাগত। সেখানে মুক্তভাবে কৃষকদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে পারতাম। শিল্পের ক্ষেত্রে দূর থেকে আরও দূরে দেখার যে বিষয়টি আমরা খুঁজে বেড়াই, তা আমি গ্রাম থেকেই পেয়েছি। দেশ বলতে আমি আমার গ্রামকেই বুঝি।’

নানা স্কুল ঘুরে নারায়ণগঞ্জ থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর সায়েন্স পড়তে চলে গেলেন কলকাতায়। কিন্তু কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টসে যাঁর প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার কথা, তাঁর বিজ্ঞান নিয়ে পড়লে চলবে কেন! আর ছবি আঁকার ঝোঁক তো মুস্তাফা মনোয়ারের নতুন নয়। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ক্লাস নাইনের ছাত্র, পড়েন নারায়ণগঞ্জ সরকারি বিদ্যালয়ে। সেই ঘটনা নিয়ে বেশ কিছু কার্টুন-ধরনের ছবি এঁকে তিনি এক প্রদর্শনী করেছিলেন শহরে। ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছিল। জেলে থাকতে হয়েছিল মাস খানেক। রক্তের ভেতর যাঁর আঁকাআঁকির নেশা, তাঁকে তো আর এসব দমাতে পারে না। কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরও তাঁর এই আঁকাআঁকি থামেনি। অঙ্কে খুবই কাঁচা মুস্তাফা মনোয়ারের পক্ষে বিজ্ঞান পড়াটা মুশকিলই হয়ে পড়েছিল। কলকাতায় তাঁদের পাশের বাড়িতেই থাকতেন সৈয়দ মুজতবা আলী। দুই বাড়ির মধ্যে আসা-যাওয়াও ছিল। মাঝেমধ্যেই মুস্তাফা মনোয়ারের আঁকা ছবি দেখতেন তিনি, প্রশংসাও করতেন। তিনিই পরামর্শ দিলেন বিজ্ঞান বাদ দিয়ে আর্ট কলেজে ভর্তি হতে।
মুস্তাফা মনোয়ারের বড় ভাবি তখন তাঁর অভিভাবক। সৈয়দ মুজতবা আলী ও ভাবি—দুজন মিলেই তাঁকে নিয়ে গেলেন কলকাতা আর্ট কলেজে। সঙ্গে যে কাজগুলো নিয়ে গিয়েছিলেন, সেগুলোই তাঁর ভর্তির পথ তৈরি করে দিল। প্রতিভা চিনতে ভুল হয়নি সৈয়দ মুজতবা আলীর। ১৯৫৯ সালে আর্ট কলেজ থেকে মুস্তাফা মনোয়ার পাস করেছেন প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে। এর আগে ছাত্রাবস্থায় কলকাতা একাডেমি অব ফাইন আর্টস আয়োজিত নিখিল ভারত চারু ও কারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স শাখায় শ্রেষ্ঠ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সোনার পদক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ছাত্র চারুকলা প্রতিযোগিতায় তেল ও জলরং—দুই শাখাতেই শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মের জন্য দুটি সোনার পদক পান। ভাগ্যিস, সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো লোকের সঙ্গে মুস্তাফা মনোয়ারের চেনাজানা ছিল আর তিনি পাশের বাড়িতেই থাকতেন!

৪.
আর্ট কলেজে পড়তে পড়তেই শিল্পের নানা পথে হাঁটা শুরু করেন তিনি। ওস্তাদ ফাইয়াজ খানের শিষ্য সন্তোষ রায়ের কাছে গান শেখার শুরুটাও তখন। পরে দীর্ঘদিন গান করেছে নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে যুক্ত থেকে। সুরের এই জগতে পরে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও পাপেট করতে এসে গান, কথা, সুর, অভিনয়, চিত্রকলা—সব কিছুকেই একসঙ্গে মেলাতে হয়েছে তাঁকে।
কলকাতা আর্ট কলেজে পড়া শেষ করার পরের বছরই (১৯৬০) ঢাকা আর্ট কলেজে যোগ দিলেন শিক্ষক হিসেবে। জয়নুল আবেদিন আগেই এ অনুরোধ করে রেখেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ারকে। ‘আমি যখন পঞ্চম বর্ষের ছাত্র, তখন কলকাতায় দেখা হয়েছিল জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে। তিনি আমাকে পড়া শেষ হলে ঢাকায় আর্ট কলেছে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আমি তখন সম্মতি দিয়েছিলাম।’ ঢাকা আর্ট কলেজে তিনি শুধু শিক্ষকতার কাজই করেননি, তখন কাজ করেছেন নাটকের সেট নিয়ে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মঞ্চ-পরিকল্পনাও করেছেন। নির্দেশনা দিয়েছেন মঞ্চ নাটকের। আর্ট কলেজে প্রথম নাটকের প্রদর্শনীটিও হয়েছিল তাঁর পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটকটি দিয়ে। এভাবেই পাঁচ বছর সময় পার করে দিলেন ঢাকা আর্ট কলেজে।

৫.
১৯৬৫ সালে ঢাকায় যখন টেলিভিশনের শুরু হলো, তখন লোক খুঁজছিলেন কলিম শরাফী ও জামিল চৌধুরী। ডাক পড়ল মুস্তাফা মনোয়ারের। আর্ট কলেজের চাকরি ছেড়ে টেলিভিশনের ‘লোক’ হলেন মুস্তাফা মনোয়ার। ‘টেলিভিশনে যোগ দেওয়া মূল লক্ষ্য ছিল বাংলা সংস্কৃতিকে নানাভাবে তুলে ধরা। তখন পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের এক ধরনের রেষারেষি ছিল। যতটা পারা যায় বাংলা সংস্কৃতিকে প্রচারের চেষ্টা আমরা করে গেছি। শিল্পীর যেহেতু অভাব ছিল, তাই শিল্পী তৈরি করার জন্য ও খুঁজে বের করার জন্য নানা অনুষ্ঠান করেছিলাম সেই ’৬৭ সাল থেকেই এবং অনেক নতুন শিল্পী আমরা এর মধ্য দিয়ে খুঁজেও পেয়েছিলাম।’
পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে যে ‘রেষারেষি’ বহু আগেই শুরু হয়েছিল, একাত্তরের মার্চ নাগাদ তা চরমে ওঠে। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস। সেদিন কিছু সরকারি ভবন ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানের পতাকা তেমন ওড়েনি। টিভিতে তখন অনুষ্ঠানের শেষে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানো দেখানো হতো। অনুষ্ঠান শেষ হতো রাত ১০টায়। এরপর জাতীয় পতাকা দেখিয়ে সম্প্রচারের সমাপ্তি। এটাই ছিল নিয়ম। মুস্তাফা মনোয়ার ঠিক করলেন, আর যা-ই হোক, ২৩ মার্চ তিনি ঢাকার টিভিতে পাকিস্তানের পতাকা দেখাবেন না। ‘সেদিন আমি রাত ১০টার আগে সম্প্রচার ও জরুরি লোকজন ছাড়া বাড়তি লোকজনকে ছুটি দিয়ে দিলাম। তখন ডিআইটির টিভিকেন্দ্রটির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন পাকিস্তানের এক মেজর। তাঁর অধীনে প্রায় ৫০ জন সৈন্য। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, অনুষ্ঠান ১০টার পরিবর্তে ১২টা পর্যন্ত চালাব। মেজর এসে আমাদের কাছে জানতে চাইলেন, আমরা অনুষ্ঠান শেষ করছি না কেন। বললাম, পাকিস্তান দিবস তো, তাই বাড়তি অনুষ্ঠান চালাচ্ছি। এ সময় আমরা বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান প্রচার করলাম। রাত ১২টার পর যখন ২৩ তারিখ পার হয়ে গেছে, তখন আমরা পাকিস্তানের পতাকা দেখিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করি। এর পরদিন থেকে আর টেলিভিশনে যাওয়া হয়নি।’
২৫ মার্চের পর আগরতলা হয়ে কলকাতা চলে যান মুস্তাফা মনোয়ার। শিল্পী হিসেবে যা করার কথা, তা-ই করেছেন তিনি। কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনের উদ্যোগে যে সাংস্কৃতিক দল গড়ে উঠেছিল, সেখানে যোগ দিয়ে দেশাত্মবোধক গান গেয়েছেন বিভিন্ন স্থানে। তখন দিল্লিতেও দল নিয়ে গেছেন তিনি। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন স্থানে ও টিভিতেও তখন অনুষ্ঠান করেছে দলটি।

৬.
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই দেশে ফিরতে হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারকে। প্রবাসী সরকারের নেতারা দেশে আসবেন, তাঁদের টিভিতে কাভারেজ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর ওপর। সেনাবাহিনীর বিমানে করে ফিরেছেন ১৮ ডিসেম্বর। দেশে ফিরেই লেগে গেলেন টেলিভিশনকে নতুন করে গড়ার কাজে। ‘পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে বাধা ছিল টেলিভিশনে। নজরুলের অনেক গান গাইতে দেওয়া হতো না। লোকগান প্রচারের ক্ষেত্রেও ছিল বাধা। নতুন করে বাংলাদেশ টিভিকে সাজাতে গিয়ে এসব জিনিস বিবেচনায় নিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের কথা প্রচার করতে অনুষ্ঠান শুরু করেছিলাম। রবীন্দ্রনাথের নাটক করার স্বপ্ন ছিল, রক্তকরবী করতে চেয়েছিলাম, এসব করার সুযোগ এল।’
বলা যায়, এ ‘সুযোগ’ কাজে লাগিয়ে টিভি অনুষ্ঠানে এক নতুন শৈলী আনার চেষ্টায় নেমে পড়েন তিনি। বানালেন রক্তকরবী ও শেকসিপয়ারের টেমিং অব দ্য শ্রু অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ করা মুখরা রমণী বশীকরণ-এর মতো নাটক। বাংলাদেশে টিভি নাটকের ইতিহাসে যেগুলো ধ্রুপদি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এই নাটক দুটি যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব টিভি ড্রামা’র জন্য মনোনীত হয়েছিল। ১৯৭২ সালে বিটিভিতে যে ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠান শুরু হয়, সেটারও রূপকার আর কেউ নন, মুস্তাফা মনোয়ার।
৭.
বাংলাদেশে এখন পাপেট শব্দটির সঙ্গে যে নামটি জুড়ে আছে, সেটি অবশ্যই মুস্তাফা মনোয়ারের। ছোটবেলা থেকেই কার্টুন বা এ ধরনের চরিত্রের প্রতি দারুণ আগ্রহ ছিল তাঁর। বিভিন্ন কার্টুনের চরিত্র কপি করারও চেষ্টা করতেন তখন। হুগলিতে গিয়ে পাপেটের সঙ্গে প্রথম ভালো করে পরিচয়। বাঁকুড়ায়ও দেখেছেন বাঁশের বড় পুতুল বা পাপেট। তিন-চার ফুটের এই পাপেটগুলোকে নিচ থেকে নাচানো হতো। এগুলো সবই তাঁর ওপর প্রভাব ফেলেছে। তবে সবচেয়ে বেশি কাজে দিয়েছে কলকাতা আর্ট কলেজে পড়ার সময় রাজস্থানি পাপেট দেখার অভিজ্ঞতা। ‘দুই সুতার এই পাপেট আমাকে দারুণ আকর্ষণ করে। অসাধারণ দক্ষতায় শিল্পীরা এগুলো দিয়ে পারফর্ম করাতেন। টিভিতে যোগ দেওয়ার আগে ঢাকা আর্ট কলেজে থাকতেই এসব নিয়ে কিছু কাজ করেছি। যোগ দেওয়ার পর বুঝলাম, টিভিতে এসব ব্যবহারের সুযোগ আছে। আমাদের দেশেও পাপেট বা পুতুলনাচের ব্যবহার ছিল, তিন সুতা ব্যবহার করে সেগুলোকে নাচানো হতো। কিন্তু এগুলোর মুখের এক্সপ্রেশন বা চোখ নাড়ানো যেত না। টিভির চাহিদা আলাদা। এখনো ক্লোজ শট, লং শট ব্যবহার করার সুযোগ আছে। তখন বিভিন্ন কারিগরি কৌশল যুক্ত করে টিভির জন্য উপযোগী পাপেট তৈরি করার কাজে নেমে পড়লাম।’

টেলিভিশনের সেই পাকিস্তান পর্বেই পাপেট চর্চার শুরু হয়েছিল এভাবেই। সেই ’৬৬ সালে টিভিতে ‘আজব দেশে’ নামে অনুষ্ঠানে তিনি ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ নামে দুটি পাপেট চরিত্র সৃষ্টি করেন, যে চরিত্র দুটির মধ্য দিয়ে তখন তিনি সে সময়কার রাজনৈতিক পরিবেশ ও এ দেশের সংস্কৃতি নিয়ে পাকিস্তানিদের বিরোধী অবস্থানকে ব্যঙ্গ করে গেছেন। ‘আমার এই অনুষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল দেশাত্মবোধ জাগানো।’ তুমুল জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠানটি চলেছিল টানা তিন বছর। স্বাধীনতার পর তিনি পাপেটের কেন্দ্রীয় একটি চরিত্র তৈরি করেছিলেন ‘পারুল’ নাম দিয়ে। ‘পারুল এক বুদ্ধিমতী মেয়ে। আমাদের রূপকথায় একটি গল্প আছে, বোন পারুল তার ঘুমন্ত সাত ভাইকে জাগিয়ে তুলেছিল। সেখান থেকেই আমি চরিত্রটির নামটি নিয়েছি। আমার উদ্দেশ্য ছিল, এই চরিত্রটির মধ্য দিয়ে আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিল্পকলা ও নান্দনিকতার বোধ জাগানো। আসলে সৌন্দর্যের বোধটি সব ক্ষেত্রেই দরকার।’ আজকে ‘মীনা’ নামে যে কার্টুন চরিত্রটি গড়ে উঠেছে, তা এই পারুল চরিত্রটির এক আলাদা রূপ।
৮.
কোনো অনুষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে যাঁর উপস্থিতি জরুরি হয়ে পড়ে, তিনি মুস্তাফা মনোয়ার। অনেক প্রশংসিত দ্বিতীয় ও ষষ্ঠ সাফ গেমসের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান পরিচালনা ও ভিজুয়ালাইজারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। ১৯৮৫ সালে ‘সার্ক সন্ধ্যার’ মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানটি হয়েছে তাঁরই নির্দেশনায়। এর নৃত্য ও সংগীত পরিচালনা—দুটোই করেছেন তিনি। এই সেদিন, ২০১০ সালে একাদশ সাফ গেমসের বিশাল মাসকট ‘কুটুম’ নামের দোয়েল পাখিটিও তাঁর করা। এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ নির্মাণের পাশাপাশি গেমসের অনুষ্ঠানের প্রোডাকশন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।
চিত্রকলা দিয়ে যাঁর শুরু, ‘ভালো’ জলরং আঁকিয়ে হিসেবে যিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন, তিনি আজ পাপেটের ‘লোক’। ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি কেবল চিত্রকলায় সীমাবদ্ধ নয়। পারফর্মিং আর্টের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক বোধকে জাগিয়ে তোলা যায়, সেই চেষ্টাই সারা জীবন করে গেছি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই চিত্রকলা আমাকে সাহায্য করেছে।’ (ঈষৎ সংক্ষেপিত)
তিনজনের বাধায় বেঁচে গেল ‘৫০০ বছর’ বয়সী বটগাছ







