রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের সামনে এক বছর আগে প্রকাশ্যে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনার ভিডিও তখন ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সৃষ্টি হয়েছিল দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ।

অবশেষে রোববার (১২ জুলাই) বিচারিক আদালতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

ভাইকে হারানোর শোকের পাশাপাশি এখন সোহাগের রেখে যাওয়া দুই সন্তানের দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছেন বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম। বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে আজও তার একটাই দাবি, ‘আমার ভাই হত্যার বিচার চাই।’

রোববার (১২ জুলাই) ভাইয়ের হত্যা মামলার শুনানি শেষে বৃষ্টির মধ্যে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ আট-নয় মাস ধরে মামলার কার্যক্রম কার্যত স্থবির ছিল। এখন চার্জ গঠনের শুনানি হয়েছে। আমরা আশাবাদী সরকার বিচার করবে। আমরা ন্যায় বিচার চাই।’

কথা বলার সময় পাশেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তারাও জানালেন, ভাইয়ের জন্য বোনের আবেগ অনেক বেশি। ভাইকে অনেক ভালোবাসতেন। দেখে-শুনে রাখার চেষ্টা করতেন। এই ঘটনার পরে বোনও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

আরও পড়ুন

পুরান ঢাকায় ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যা: ২১ আসামির বিচার শুরু

পরে মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘এক বছর হয়ে গেলো। কত জায়গায় গেছি, কত মানুষের কাছে ধরনা দিয়েছি। শুধু একটা বিচার চাই। আমরা আশা করি, এবার যেন বিচার দ্রুত শেষ হয়। আমরা যেন ন্যায় বিচার পাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিচারটা সুষ্ঠুভাবে করার দাবি জানাই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছেও আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তার কাছে যদি আমাদের বার্তাটি পৌঁছানো যায়। আমরা মনে করবো, এই বিচারটা হলে দেশবাসীও অনেক খুশি হবে। যে তারেক রহমান ন্যায় বিচারের পক্ষে আছেন, তিনি ন্যায় বিচার করেন।’

ভাই নেই, সোহাগের দুই সন্তানের দায়িত্ব এখন বোনের কাঁধে

সোহাগের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় ধাক্কা নেমে আসে তার পরিবারে। তিনি রেখে গেছেন এক ছেলে ও এক মেয়েকে। কিন্তু সন্তানদের রেখে চলে গেছেন তাদের মা। এরপর থেকেই সন্তান দুটির দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন সোহাগের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম ও তার স্বামী।

jagonews24হত্যার শিকার ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ। ছবি: সংগৃহীত

সোহাগের বড় মেয়ের বয়স ১৬ বছর। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে সে। আর ছেলের বয়স ১২ বছর। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশুনা করে সে।

কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত বোন

‘আমার নিজের শরীরও ভালো না। তারপরও ভাইয়ের দুই সন্তানকে মানুষ করার চেষ্টা করছি। তাদের তো কেউ নেই। আমি আর আমার স্বামীই এখন তাদের বাবা-মা,’ বলেন তিনি।

আরও পড়ুন

মিটফোর্ডে নৃশংসতা: এক বছরেও শুরু হয়নি ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যার বিচার

মঞ্জুয়ারা বেগম জানান, বর্তমান সরকারের মাধ্যমে দুই দফায় মোট ৭৫ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছেন তারা। তবে সেই সহায়তা তাদের কাছে মুখ্য নয়।

তার ভাষায়, ‘আমাদের কোনো আর্থিক সাহায্য দরকার নেই। আমরা শুধু আমার ভাই হত্যার বিচার চাই।’

মোবাইল নিয়ে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে ব্যবসার সব হিসাব

মঞ্জুয়ারা বেগম জানান, সোহাগ ভাঙারির ব্যবসা করতেন। অনেক মানুষের কাছে তার টাকা পাওনা ছিল। কিন্তু ব্যবসার সব হিসাব-নিকাশ, দেনা-পাওনার তথ্য মোবাইল ফোনে সংরক্ষিত ছিল।

তিনি অভিযোগ করেন, হত্যার সময় সেই মোবাইল ফোনও নিয়ে যায় হত্যাকারীরা।

‘আমরা খুব ভয়ে থাকি। বারবার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মামলা তুলে নিতে বলা হচ্ছে। না হলে বাচ্চাদের তুলে নেবে, আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যাবে,’ সোহাগের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম

‘ভাইয়ের মোবাইলটাই নিয়ে গেছে। সেখানে সব হিসাব ছিল। কার কাছে কত টাকা পাবে, সব তথ্য ছিল। এখন কোনো প্রমাণই আমাদের হাতে নেই,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও জানান, অন্যদিকে যদি কারও কাছে ভাইয়ের কোনো দেনা থেকে থাকে, সেগুলোও তারা আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

‘চাঁদা না দেওয়াতেই আমার ভাই খুন হয়’

হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে মঞ্জুয়ারা বেগমের অভিযোগ, চাঁদাবাজির জেরেই পরিকল্পিতভাবে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ভাইয়ের পরিচিত কয়েকজন দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। কিন্তু সোহাগ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিল, বন্ধু হয়েও যদি ব্যবসা করতে না দেয়, তাহলে সেটা অন্যায়।’

তার দাবি, এরপর পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে সোহাগকে হত্যা করা হয়।

‘মামলা তুলে নিতে সন্তান অপহরণের হুমকি’

মামলার বাদী হওয়ায় এখনো ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছে বলে জানান মঞ্জুয়ারা বেগম।

তার অভিযোগ, ‘আসামিপক্ষ বিভিন্নভাবে মামলা তুলে নেওয়ার চাপ দিচ্ছে। এমনকি সন্তানদের অপহরণ ও স্বামীকে জিম্মি করার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

চাঁদাবাজি নয়, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে খুন হন সোহাগ: পুলিশ

‘আমরা খুব ভয় নিয়ে থাকি। বারবার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মামলা তুলে নিতে বলা হচ্ছে। না হলে বাচ্চাদের তুলে নেবে, আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যাবে,’ বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই আবেদন

মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, আমরা কোনো সহানুভূতি বা অর্থ চাই না। রাষ্ট্রের কাছে একমাত্র প্রত্যাশা—হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার।

তিনি আরও বলেন, ‌‘আমাদের কষ্টের কথা যেন দেশের দায়িত্বশীল মানুষ জানেন। আমরা শুধু চাই, যারা আমার ভাইকে এভাবে হত্যা করেছে, তাদের যেন আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি হয়।’

২১ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন, শুরু বিচার

এই হত্যা মামলায় ২১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠনের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে আলোচিত এ মামলার বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।

রোববার (১২ জুলাই) ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে আদালত মামলার জামিনে থাকা সব আসামির জামিন বাতিল করেন। তবে তিন আসামি হাইকোর্ট থেকে জামিন নেওয়ায় তাদের জামিন বহাল রয়েছে।

শুনানি শেষে বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়াউল হক জাগো নিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, আদালত দণ্ডবিধির ৩০২, ১৪৩ ও ৩৪ ধারায় ২১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে মামলার বিচারিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।

jagonews24আদালতে আইনজীবী জিয়াউল হকের সঙ্গে নিহত সোহাগের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম/ছবি: আশিকুজ্জামান

মামলার নথি অনুযায়ী, গত বছরের ৯ জুলাই রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্যে পিটিয়ে, ইট-পাথর দিয়ে আঘাত করে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে হত্যা করা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

হত্যাকাণ্ডের পরদিন নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রে ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। পরে সম্পূরক অভিযোগপত্র গ্রহণের পর মামলাটি বিচারের জন্য মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়।

আরও পড়ুন

একটি হত্যা, শ্বাসরুদ্ধকর জবানবন্দি ও একটি মৃত্যু

তদন্তে বলা হয়েছে, ভাঙারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে লাল চাঁদকে হত্যা করা হয়। বর্তমানে মামলার কয়েকজন আসামি কারাগারে থাকলেও কয়েকজন এখনো পলাতক। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়াউল হক জাগো নিউজকে বলেন, আদালত সম্পূরক অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন। এখন মামলাটি চার্জ গঠন হলো। সরকারের পক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও এক বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমাদের প্রত্যাশা আমরা ন্যায় বিচার পাবো।

২১ আসামির মধ্যে আটজন এখনো পলাতক

সম্পূরক অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১০ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে ১৩ জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তবে সারোয়ার, মনির, অপু, জহির, ইমরান, শারাফাত, হোসেন চৌকিদার ও জিয়াউদ্দিনসহ আটজন এখনো পলাতক।

jagonews24ব্যবসায়ী সোহাগকে হত্যার দৃশ্য পেনসিল স্কেচে। ছবি: এআই নির্মিত

তদন্তে বলা হয়েছে, ভাঙারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে হত্যা করা হয়।

এমডিএএ/এমআইএইচএস