ফরিদপুরের ভাঙ্গায় প্রতিপক্ষের আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে সুমন শেখ (২০) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত দুই গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশ, সাংবাদিকসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়। এ ঘটনায় ১৭ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
আজ বুধবার সকালে সুমন শেখের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান। নিহত সুমন ভাঙ্গা পৌরসভার পূর্ব সদরদি গ্রামের মিলন শেখ ওরফে মিলন বাবুর্চির ছেলে। ভাঙ্গা দক্ষিণপাড় বাসস্ট্যান্ডে তাঁর একটি ফাস্টফুডের দোকান রয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের গোলচত্ত্বর এলাকায়। পরে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের ভাঙ্গা গোলচত্ত্বর ও ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ভাঙ্গা দক্ষিণপাড় বাসস্ট্যান্ড এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় পৌরসভার হাসামদিয়া ও পূর্ব সদরদি গ্রামের বাসিন্দারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের সঙ্গে অন্তত আরও তিনটি গ্রামের বাসিন্দা অংশ নেন। বুধবার বেলা ১১টা থেকে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পূর্ব সদরদি ও হাসামদিয়া গ্রামের কয়েক যুবকের মধ্যে পূর্ব শত্রুতা রয়েছে। এর জের ধরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হাসামদিয়া গ্রামের ফয়সাল মাতুব্বর নামে এক যুবকের নেতৃত্বে ভাঙ্গা দক্ষিণপাড় বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তিন যুবককে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় অপর পাড়ে। খবর পেয়ে সুমন শেখসহ আরও কয়েকজন সেখানে যান। একপর্যায়ে বাগ্বিতণ্ডা থেকে হাতাহাতি শুরু হয়। তখন অতর্কিতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র বের করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়।
গোলাগুলির খবরে দ্রুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে উভয় গ্রামের বাসিন্দারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। মহাসড়কের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে তাঁদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারাও এতে অংশ নেন। এ সময় ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের প্রায় ৩০টি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেও প্রথমে ব্যর্থ হয়। এ সময় পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হলে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শী এক যুবকের ভাষ্য, দুই গ্রামের যুবকদের মধ্যে হাতাহাতির একপর্যায়ে সেখানে হাজির হন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব সজিব মাতুব্বর। এরপর ১০ মিনিটের মধ্যে তিনি আগ্নেয়াস্ত্র বের করে এলোপাতাড়ি গুলি চালান। গুলিতে ঘটনাস্থলেই সুমন শেখ লুটিয়ে পড়েন। পরে সুমনকে উদ্ধার করে প্রথমে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলেও পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যান। ঢাকায় নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।
ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তানসিভ জোবায়ের নাদিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আশঙ্কাজনক অবস্থায় এক যুবককে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁর মুখের চোয়ালের দিকে গুলিসদৃশ বস্তু ভেদ করে মাথার এক পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। ধারণামতে, সেটি শর্টগানের গুলি হতে পারে। যার ফলে তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় এবং দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেলে পাঠানো হয়।’
নিহতের চাচাতো ভাই জিহাদ শেখ মুঠোফোনে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ফরিদপুর মেডিকেলে না নিয়ে আমরা দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে এসেছিলাম কিন্তু ওরে বাঁচানো যায়নি। এখানে আনার পর ডাক্তার মৃত ঘোষণা করে দিয়েছে। এখন লাশ বাড়িতে নেওয়ার কার্যক্রম চলছে।’
জিহাদ শেখ অভিযোগ করে বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমাদের গ্রামের শরিয়াতুল্লাহ নামে এক যুবককে হাসামদিয়া গ্রামের ফয়সালসহ কয়েক যুবক মারধর করে। পরে সেটি মুরব্বিরা বসে মিমাংসা করে দেয়। কিন্তু আজ সন্ধ্যার (মঙ্গলবার) আগে হাসামদিয়ার কয়েক যুবক বাসস্ট্যান্ড থেকে আমাদের ৩ জন লোক তুলে নিয়ে যায়। তখন সুমনসহ কয়েকজন ছুটে যায়। তাঁদের মধ্যে তর্কবিতর্ক হয়, এর দশ মিনিটের মধ্যেই হাসামদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকদলের সাধারণ সম্পাদক সজিব মাতুব্বর আগ্নেয়াস্ত্র বের করে এলোপাতাড়ি ফায়ার করে। সজিবের গুলিতে আমার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে।’ আরও তিনজনের কাছেও পিস্তল ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সুমনের মৃত্যুর খবরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো বাসস্ট্যান্ড এলাকা। এ সময় সড়কের ওপর আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়। এতে তিন ঘণ্টা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। ভোগান্তিতে পড়েন হাজার হাজার সাধারণ যাত্রী।
ভাঙ্গা থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ সংঘর্ষের ঘটনায় রাতেই অভিযান চালিয়ে ১৭ জনকে আটক করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ দিলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’








