মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের ফলে রোববারও ঢাকায় থেমে থেমে কখনো হালকা কখনো মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ হয়েছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে বৃষ্টির ধারা। এতে নগরীর অলিগলি রাজপথ আবাও ভেসে যায়। এতে করে সব শ্রেণিপেশার মানুষ দুভোগে পড়েন। তবে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ ছিল অসহনীয়।
শুক্রবার রাত থেকে শুরু হয়ে শনিবার এবং রোববার দুপুর পর্যন্ত বিরতিহীন বৃষ্টি হয়েছে। বর্ষার মৌসুমে প্রতি বছরই রাজধানীর সড়কে পানি জমে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি বড় ধরনের যানজটের সৃষ্টি হয়। এবারের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। যা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি। নগরীর দুটি বড় লেক ভরে আশপাশের সড়ক, ফুটপাতের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। ধানমন্ডি লেকের পানি ছাপিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। গুলশান, বনানী ও বারিধারা লেকের পানিও ছাপিয়ে যাওয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা সিটি করপোরেশন রীতিমতো শঙ্কায় পড়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকার পানি নিষ্কাশনের যে সক্ষমতা রয়েছে তাতে এত ভয়াবহ পরিস্থিতি হওয়ার কথা নয়। এ জন্য কারণ বিশ্লেষণ করছেন তারা। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত যুগান্তরকে বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অল্প সময়ে বেশি পরিমাণ বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে। দিন দিন এটা বাড়বে; জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এমনটা ঘটছে।
রাজধানী ঢাকার দুই সিটির ডোবা, নালা ও জলাশয়গুলো ভরাট হওয়ার কারণে সামনের দিনগুলোতে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা অনেক বেশি। ঢাকার পানি নিষ্কাশনের যে অবস্থা, ভারি বৃষ্টিপাত না হলেও তা যথাযথভাবে নিষ্কাশন করা সম্ভব নয়। কারণ খালগুলো বেদখল হয়েছে। অনেক খাল বক্সকালভার্টে পরিণত করা হয়েছে। খালগুলো দখলমুক্ত করার তাগিদ দেন তিনি।
আইনুন নিশাত আরও বলেন, ঢাকার ভূ-প্রকৃতি হলো মাঝখানটা উঁচু এবং চারদিকে নিচু। ঠিক যেন কচ্ছপের পিঠের মতো। ২০১৫ সালে ঢাকার জলাবদ্ধা বা পানি নিষ্কাশন বিষয়ে একটি গবেষণা করা হয়েছে। সেখানে জলাবায়ু পরিবর্তনজনিত বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি ঢাকার বিদ্যমান বাস্তবতায় করণীয় বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সরকারকে সেসব পরামর্শ ও গবেষণা পর্যালোচনা করে সেসব বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
ডেমরা পরিস্থিতি : আমাদের প্রতিনিধি জানান, টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ডেমরার বাসিন্দারা নাকাল অবস্থায় পড়েছেন। প্রতিদিন সকালে ঘুম ভেঙে দেখেছেন ঘরের আঙিনা, রান্নাঘর এমনকি বসবাসের কক্ষেও পানি ঢুকে পড়েছে। এতে করে রান্নাবান্না, শিশু ও বয়স্কদের চলাচল, খাবার সংরক্ষণসহ দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সবকিছুই স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারের কাছে এক বেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের। সরেজমিন দেখা গেছে, হাজীনগর, বামৈল, ডগাইর, মুরগির ফার্ম, ছোট মুরগির ফার্ম, দেইল্লা, আমুলিয়া পাইটি, ধীৎপুরা, বড়ভাঙ্গা, বোর্ডমিল ও গ্রিন সিটি এলাকার অসংখ্য বাড়ির ভেতরে হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। কোথাও গৃহিণীরা বালতি দিয়ে পানি সেচে ঘরকে বসবাসের উপযোগী করার চেষ্টা করছেন, আবার কোথাও বৈদ্যুতিক মোটর পাম্প দিয়ে ঘরের পানি বের করা হচ্ছে। অনেক পরিবার দরজার সামনে অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করে পানির প্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা করেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, শুধু বসতবাড়িই নয়, তলিয়ে গেছে ক্ষেত, খামার ও বীজতলা। এতে শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছিল অঘোষিত ছুটির পরিবেশ। অনেক শিক্ষার্থী ঘর থেকেই বের হতে পারেননি।
এদিকে, বৃষ্টি ও ড্রেনের পানি মিশে একাকার হয়ে যাওয়ায় চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত রোগ বালাই। শিশু ও বয়স্করা চরম কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জোন ৮-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহির হোসেন বলেন, পানি নিষ্কাশনের খালগুলো আগের তুলনায় অনেকটাই অবমুক্ত ও পরিষ্কার থাকায় দুর্ভোগ কিছুটা কম হয়েছে।
তবে নিচু এলাকায় অবস্থিত পুরোনো কিছু বাড়িতে জলাবদ্ধতার সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।
সবুজবাগ : আমাদের প্রতিনিধি জানান, টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণে রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মুগদা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, গোড়ান, মানিকনগর, তালতলা, মতিঝিল, মালিবাগ, আরামবাগ, গুলিস্তান ও পল্টনসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ নগরবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নালা-নর্দমা ও পাইপলাইনে জমে থাকা ময়লা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
রাজধানীবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। প্রতিটি ভারি বৃষ্টির পরই তাদের ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে যায়। শিশুদের লেখাপড়া ব্যাহত হয়। কর্মজীবী মানুষ কাজে যেতে পারেন না। স্বাভাবিক জীবন যেন পানির কাছেই অসহায় হয়ে পড়ে। তাদের দাবি, সাময়িক ব্যবস্থা নয়, জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত স্থায়ী ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফারুক হাসান মো. আল মাসুদ যুগান্তরকে বলেন, শনিবার নগরীর যেসব সড়ক পানির নিচে তলিয়ে ছিল, রোববার সেসব সড়কের অনেকাংশে জলাবদ্ধতামুক্ত হয়েছে। যেসব এলাকার সড়ক জলাবদ্ধতামুক্ত হয়নি সেসব এলাকার সড়কের পানি অপসারণের জন্য কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাজীব খাদেম যুগান্তরকে বলেন, দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন পয়েন্টে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল। অধিকাংশ এলাকার পানি নেমে গেলেও কিছু কিছু এলাকায় পানি এখনো রয়েছে। সেসব নিষ্কাশনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এবারের বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্ট জলাবদ্ধ হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে তার সমাধান করার চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে কিছু কারণ চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।








