ভারতের উত্তর প্রদেশে গাড়ি ওভারটেক করাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর লাঠিসোঁটা ও কুঠার নিয়ে নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
এই দাবিতে কয়েকটি পোস্ট আছে এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
‘Mohi Creation’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত ৪ জুলাই শেয়ার করা একটি ভিডিও আলোচিত দাবিতে সম্ভাব্য সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। ৮ জুলাই দুপুর পর্যন্ত ভিডিওটি প্রায় ৪ লাখ ৬৬ হাজার বারের বেশি দেখা হয়েছে। পোস্টটিতে ৩ হাজার ৬০০ রিয়েকশন ও ২ হাজার ৩০০-এর বেশি শেয়ার রয়েছে। একইভাবে ‘Mehedi Hasan Zaki’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকেও ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। পোস্টটিতে বাংলাদেশি পর্যটকদের উদ্দেশে করে লেখা হয়, ‘নির্লজ্জ বেহায়াদের জন্য এটাই প্রাপ্তি।’
শেয়ার করা পোস্টগুলোর কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ নেটিজেনই দাবিটিকে সত্য ভেবে ভারতের ওপর ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন।
আলোচিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ে সম্প্রতি ভারতের উত্তর প্রদেশে বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর কোনো হামলার ঘটনা ঘটেছে কি না, তা নিয়ে দেশের এবং ভারতীয় গণমাধ্যমে অনুসন্ধান করে এমন কোনো খবরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পরে ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে অনুসন্ধানে, ‘ASIADecoded’ নামের একটি ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও পাওয়া যায়। গত ৬ জুলাই শেয়ার করা ওই ভিডিওর সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওর হুবহু মিল পাওয়া যায়। ভিডিওর ক্যাপশনে ইংরেজি ভাষায় দাবি করা হয়, ‘মোদির হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা’ মুসলিমদের হাত থেকে সুরক্ষার নামে চাঁদা, যাকে তারা ‘প্রোটেকশন মানি’ বলে, দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় একটি দলিত পরিবারের ওপর কুঠার ও লাঠি দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় এক নারীসহ দুজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আরও দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন।’
তবে প্রচারিত ওই ভিডিওর ভেতরে ‘ভারত যাবার এত শখ আমাদের প্রথম দিনেই ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ ভারতে যাবার আবেদন করেছেন। এই তো যাওয়া মাত্রই আদর আপ্যায়ন করে শখ মিটিয়ে দিচ্ছে’ লেখা পাওয়া যায়।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে ভারতীয় গণমাধ্যম ‘Live Hindustan’-এ গত বছরের ৫ এপ্রিল হিন্দি ভাষায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির দৃশ্যের মিল রয়েছে।
লাইভ হিন্দুস্তানের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনাটি উত্তর প্রদেশের নয় এবং এর সঙ্গে কোনো বাংলাদেশির কোনো সম্পর্ক নেই। এটি মূলত ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের ফরিদাবাদের ‘ভারত কলোনি’ এলাকার একটি ঘটনা। সেখানে প্রতিবেশীদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাতে নিশিকান্ত চৌহান ও তাঁর শ্যালক রঘুরাজ কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরে দেখেন, তাঁদের বাড়ির সামনে এক প্রতিবেশী উচ্চস্বরে ঝগড়া ও অশালীন ভাষায় গালাগালি করছেন। নিশিকান্ত তাঁকে বাড়ির সামনে এমন আচরণ করতে নিষেধ করলে ওই প্রতিবেশী ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের ডেকে আনেন। এরপর দেবা, শুভম, শিবম ও গোপাল নামের কয়েকজন ব্যক্তি লাঠি, কুঠার ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে নিশিকান্তদের ওপর হামলা চালায়। চিৎকার শুনে নিশিকান্তের স্ত্রী সবিতা চৌহান এবং দুই ছেলে রক্ষা করতে এলে হামলাকারীরা তাঁদেরও মারধর করে। সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হওয়া প্রায় ২০ মিনিটের ওই ঘটনায় পরিবারের এক নারীসহ পাঁচজন গুরুতর আহত হন। পুলিশ পরবর্তীতে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায় এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করে। তবে প্রতিবেদনে কোথাও চাঁদা, দলিত পরিচয় বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে হামলার কথা উল্লেখ নেই। এ ছাড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী কোনো নিহতের ঘটনাও ঘটেনি।
সিদ্ধান্ত
ভারতের উত্তর প্রদেশে বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর হামলা দাবিটিতে ছড়ানো ভিডিওটি ভিন্ন ঘটনার। মূলত, ভারতের হরিয়ানায় প্রতিবেশীদের মধ্যে বিবাদের একটি পুরোনো সিসিটিভি ফুটেজকে ‘বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর হামলা’ দাবি করে সামাজিক যাগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে।








