রোববার মধ্যরাতে দেশে স্মরণকালের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের যে চিত্র যুগান্তরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগেরই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সচলতার এক বড় ব্যত্যয়। যদিও রাজধানী ঢাকা এখনো তুলনামূলক সহনীয় পরিস্থিতিতে রয়েছে, তবে মফস্বল ও গ্রামীণ জনপদের অবস্থা মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। দৈনিক ৮ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কলকারখানার চাকা আজ স্থবির হওয়ার উপক্রম। বলা বাহুল্য, ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াটের বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও তীব্র অর্থ ও জ্বালানি সংকটের কারণে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়া এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর তেলের শূন্য মজুত আমাদের সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতাকেই স্পষ্ট করে।
জানা যায়, পিডিবির কাছে সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বকেয়া পাওনা ৪৫ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। বেসরকারি আমদানিকারকরা ৭-৮ মাসের বিল না পেলে নতুন করে জ্বালানি তেল কিনবে কীভাবে-এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং জনগণের কষ্ট লাঘবে আমরা মনে করি, সরকারের উচিত তিন ধাপের একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর রোডম্যাপ নিয়ে অবিলম্বে মাঠে নামা। সেক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদে জরুরি বন্ড বা বিশেষ তহবিল বরাদ্দের মাধ্যমে বকেয়া অর্থের একটি বড় অংশ দ্রুত ছাড় করতে হবে, যেন বেসরকারি কেন্দ্রগুলো অবিলম্বে ফার্নেস অয়েল আমদানি করে উৎপাদন চালু করতে পারে। পাশাপাশি, সাময়িকভাবে শিল্প খাতকে সচল রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক অন্তত ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
মধ্যমেয়াদে রামপাল ও এস আলমের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর যান্ত্রিক ত্রুটি ও বকেয়া মিটিয়ে সেগুলোকে দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরাতে হবে। একই সঙ্গে ঢাকার ওপর লোডশেডিংয়ের চাপ কিছুটা ভাগ করে দিয়ে মফস্বলের এই চরম বৈষম্য ও লোডশেডিংয়ের সময়সীমা সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা জরুরি। আর দীর্ঘমেয়াদে, আমদানিকৃত অতিব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে স্থায়ীভাবে ঝুঁকতে হবে। এমন বিপর্যয়কে কেবল যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে আড়াল করার বদলে দরকার এর মূল অর্থনৈতিক ও সরবরাহগত সংকটের টেকসই সমাধান করা।






