বর্তমানে বিনিয়োগে চরম মন্দা বিরাজ করছে। এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়েছে। দেশে বেসরকারি বিনিয়োগের খরা কাটছে না। বিদেশি বিনিয়োগেও একটা স্থবিরতা রয়েছে। দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় কয়েকটি সমস্যার মধ্যে রয়েছে-দুর্নীতি, ঋণের উচ্চসুদ, জ্বালানি সংকট, করের চাপ, ডলারের ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ। সরকারি এক তথ্য থেকে জানা যায়, ইরান যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের ৪ বিলিয়ন ডলার (৫০ হাজার কোটি টাকা) ক্ষতি হয়ে গেছে। এ ক্ষতি বাড়ছে প্রতিনিয়তই। এ অবস্থায় নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, পুরোনো উদ্যোক্তারাই বিদ্যমান ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। দেশে বেসরকারি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে প্রাণ ফেরাতে হলে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসতে হবে। কেননা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রথমেই দেখবে বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি হার সাড়ে ৫ শতাংশ অতিক্রম করেছে কিনা, স্থানীয় বেসরকারি খাত এগিয়ে আসছে কি না, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর ঠিকমতো কাজ করছে কি না ইত্যাদি। সুতরাং আমরা নিজেদের অর্থনীতির চলমান খাতগুলোকে যদি নিজেরাই ঠিক না করি, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আমাদের এখানে এসে কী করবে? তারা তো ঋণ বিক্রেতা। আইএমএফ বলি, বিশ্বব্যাংক বলি, তারা তো আমাদের কাছে ঋণ বিক্রি করতে চাইবে। কারণ বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আছে। এখন আমরা যদি নিজেরা হাত গুটিয়ে বসে থাকি এবং ওদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে দু-একটা প্রজেক্ট করেই ক্ষান্ত হয়ে যাই, তাহলে তো দেশ এগোবে না।
বর্তমান বিনিয়োগের খরা কাটাতে কিছু বিষয় আমাদের মাথায় রাখতে হবে। দেশে এমনিতেই পুঁজির সংকট, এরপর ঋণের সুদ অত্যন্ত বেশি। সুদ কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই। এই হারে ট্যাক্স এবং ঋণের উচ্চসুদ দিয়ে কেউ বিনিয়োগ করতে আসবে বলে মনে হয় না। বর্তমান এ হারে সুদ ও কর দিয়ে সৎভাবে কেউ ব্যবসা করলে তার লোকসান হবে। আর লোকসান দিতে কেন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন? সরকারও এটি স্বীকার করে। পরিস্থিতি উত্তরণে যে কোনো মূল্যে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ সরকারের লক্ষ্য কর্মসংস্থান বাড়ানো। আর বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে না। এক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন বাজেট জরুরি। অন্যদিকে আয় বাড়াতে সরকারি কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসতে হবে।
যা হোক, দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ফান্ডিং করতে হবে সরকারকে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে। কেননা আশানুরূপ কিছু হলে সেখানে মানুষ টাকা দিতে রাজি আছে। সরকারি সুকুক, ইসলামি বন্ড, মানুষ কিনতে রাজি আছে, যতি এগুলোতে ক্যাশ ফ্লো থাকে। তবে সরকার জনগণকে অফার না করলে তো হবে না। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলো সিকিউরিটাইজেশন করার মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে সরকার টাকা নিতে পারে। তবে পুরোনো প্রকল্পগুলো দিয়ে হবে না। কারণ যেসব প্রকল্পের মেয়াদ ২০ বছরের বেশি হয়ে গেছে এবং যেসব প্রকল্প ভেঙে পড়ার মতো আশঙ্কা রয়েছে, এমন প্রকল্পের অধীনে সরকারি বন্ড সুকুক ছাড়লে জনগণ সেগুলো কিনবে না। নিয়ম হচ্ছে, যে প্রজেক্টে ক্যাশ ফ্লো আছে, ওটার বিপরীতে সিকিউরিটাইজেশন করে জনগণের মাঝে অ্যাসেট বিক্রি করে দেওয়া যায়। কারণ যেখানে লাভ আছে, মানুষ সেখানেই তো বিনিয়োগ করবে। যা থেকে রিটার্ন পাওয়া যাবে, সেসব প্রকল্পে মানুষ টাকা লগ্নি করবে। একসঙ্গে টাকা দিয়ে দেবে। তখন সরকারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ চলে আসবে। তখন পদ্মা সেতুর মতো আরও বড় বড় প্রকল্পে হাত দিতে পারবে। বসে থাকলে তো আর দেশ এগোবে না।
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে একটা দিকনির্দেশনা আমরা পেয়েছি। রেমিট্যান্স বাড়াতে ৭ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। এটা অবশ্যই একটা ইতিবাচক দিক। কেননা এতে করে বিদেশে কর্মরত আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বৈধপথে টাকা পাঠাতে উৎসাহী হবেন। হুন্ডি অনেকটাই কমে যাবে বলে আশা করছি। তবে শুধু রেমিট্যান্স দিয়ে তো হবে না। অন্য অর্থনৈতিক সোর্সগুলোর জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের রপ্তানি বাড়তে হবে। বন্ধ কারখানাগুলো চালু করতে হবে। নতুন নতুন শিল্প ও কলকারখানায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য যত ধরনের কৌশল আছে, সরকারকে তা অনুসরণ করতে হবে। এতে শিল্প ও কলকারখানায় কর্মসংস্থান বাড়বে। বেকার সমস্যা থেকে রেহাই পাবে দেশ।
এসব ক্ষেত্রে সরকারকে আপাতত লিড নিতে হবে। কারণ যখন অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে, কর্মসংস্থান ঘাটতি এবং কনজাম্পশন বেড়ে যায় তখন, জন মেনার্ড কেইনস বলেছেন, সরকারি উদ্যোগে ব্যয় বাড়াতে হবে। ঘাটতি বাজেট করতে হবে। তারপর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তখন প্রাইভেট সেক্টর এগিয়ে আসবে।
আমাদের অর্থমন্ত্রী অনেক প্র্যাগমেটিক। অর্থনীতিতে ভালো কিছু একটা আশা করছি। তার হাত দিয়ে অর্থনৈতিক চমক দেখতে চায় জনগণ। বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন নিয়ম করেছে, ২ হাজার কোটি টাকা পেইড আপ ক্যাপিটাল বা পরিশোধিত মূলধন থাকতে হবে ব্যাংকগুলোর। দু-একটি ব্যাংক ছাড়া ২ হাজার কোটি টাকা পেইড আপ ক্যাপিটাল কোনো ব্যাংকের নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, ২ হাজার কোটি টাকা হলেও ৫০ শতাংশের বেশি ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিতে পারবে না কোনো ব্যাংক। এ বিষয়টি তো শেয়ারবাজারের স্বার্থের বিরুদ্ধে। পৃথিবীতে কোথায় আছে যে, আমি আয় করব, কিন্তু দিতে পারব না? আসলে আমরা হয়ে গেছি পৃথিবীবিমুখ জাতি। কেননা পৃথিবীর সবাই চলে একদিকে, আর বাংলাদেশ চলে আরেকদিকে। আসলে এ বিষয়গুলো নিয়ে অনুসন্ধানমূলক রিপোর্ট হওয়া উচিত। ২ হাজার কোটি টাকার উপরে পেইড আপ ক্যাপিটাল আছে ন্যাশনাল ব্যাংকের। অথচ ন্যাশনাল ব্যাংক বসে গেছে। বলতে গেলে এটি ফেল করা একটি ব্যাংক। এটা কী প্রমাণ করে? এটা প্রমাণ করে, ক্যাপিটাল বাড়লেই যে একটা ব্যাংক ভালো হবে, তা ঠিক নয়। তাহলে তো ন্যাশনাল ব্যাংক ভালো হতো। এখন সিটি ব্যাংক বলি, ইবিএল বলি আর উত্তরা ব্যাংকই বলি-প্রত্যেকেরই পেইড আপ ক্যাপিটাল ২ হাজার কোটি টাকার নিচে। অথচ এ ব্যাংকগুলো দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যাংক। এখন তাদের বাধ্য করা হচ্ছে বোনাস শেয়ার দিতে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২ হাজার কোটি টাকা হলেই হবে না, এরপরও ক্যাশ ডিভিডেন্ড ৫০ শতাংশের বেশি দেওয়া যাবে না। তাহলে এদের অপরাধটি কী? সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোথায় যাবে তাহলে? একটা ব্যাংক যদি লাভ করে, তাহলে তার ৫০ শতাংশ কেন দিতে হবে, ৬০-৭০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিলে ক্ষতিটা কী? বাংলাদেশ ব্যাংক কী বুঝে এ সার্কুলার জারি করেছে আমার জানা নেই। বিশ্বের কোন দেশে এ ধরনের প্র্যাকটিস আছে, বাংলাদেশ ব্যাংক খোলাসাভাবে তা দেখাক না। তাহলে না হয় বুঝব, বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ ব্যবস্থা চালু থাকলে আমাদের অসুবিধা কোথায়। ব্যাংকের মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করার পক্ষে আমি নিজেও। কিন্তু তাই বলে ব্যাংকব্যবস্থায় যারা ভালো করছে, জোরজবরদস্তি করে তাদের ডিভিডেন্ড প্রদানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা কি যুক্তিযুক্ত হবে? তাহলে শেয়ারবাজারে কী বুঝে মানুষ বিনিয়োগ করবে?
আসলে এ বিষয়গুলো নিয়ে একটা সঠিক মতৈক্যের প্রয়োজন। এটার জন্য প্রয়োজন মাননীয় অর্থমন্ত্রী এবং গভর্নর বসে একটা ফয়সালা করা। একদিকে আমরা শেয়ারবাজার ভালো করতে চাচ্ছি, অপরদিকে শেয়ারবাজারের সার্বিক স্বার্থবিরোধী পলিসি ডাইরেক্টরি প্রণয়ন করছি, তাহলে তো হবে না। সুতরাং আমার কাছে মনে হয়, এটা রিভিউ করা উচিত।
এখানে আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো-পর্যাপ্ত মাত্রায় ক্যাশ ডিভিডেন্ড যদি না দিতে পারে, তাহলে এনবিআর পর্যাপ্ত ট্যাক্স পাবে না। কারণ ট্যাক্সনির্ভর করে ক্যাশ ডিভিডেন্ডের ওপর। সবচেয়ে বেশি ট্যাক্স সংগ্রহ হয় ব্যাংক খাত থেকে। এখন ব্যাংকগুলো যদি ক্যাশ ডিভিডেন্ড আর্নিংয়ের ৫০ শতাংশের বেশি দিতে না পারে, তাহলে এনবিআর ট্যাক্স পাবে না এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারপরও আমি বলব, আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো-ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ক্যাশ ডিভিডেন্ডের ব্যবহার কীভাবে করছে, সেগুলো একটু দেখা উচিত। দেখেশুনে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্তে আসা উচিত বলে মনে করি। (অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার)
আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান আইসিবি




