দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বরাদ্দ নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এতদিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক বাজেটের সঙ্গে গবেষণা খাতের বরাদ্দ সরাসরি দেওয়া হতো। কিন্তু চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে সেই অর্থ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে যাচ্ছে না। এবার গবেষণার পুরো বরাদ্দ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। সেখান থেকেই আবেদনের চাহিদাভিত্তিক অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত একাডেমিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করবে, বাড়াবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। তাছাড়া দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় গতি কমে যেতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। তবে ইউজিসির দাবি, এতে গবেষণায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা বাড়বে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্ব শুধু পাঠদান নয়; নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করাও অন্যতম প্রধান কাজ। সেই গবেষণার অর্থ যদি বাইরে চলে যায়, তাহলে একাডেমিক স্বাধীনতা, গবেষণার গতি এবং উদ্ভাবনী পরিবেশ কতটা প্রভাবিত হবে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।

ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার বরাদ্দ নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হবে না। সবই আগের মতোই হবে।

ইউজিসির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার জন্য ২২৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গবেষণা অর্থায়নকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও গবেষকবান্ধব করার লক্ষ্যেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা বা গবেষণার বৈচিত্র্য ক্ষুণ্ন হবে না।’ তবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি।

ইউজিসির কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বরাদ্দ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ এবং অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় অর্থ মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান যুগান্তরকে বলেন, গবেষণার বাজেট বরাদ্দ নিয়ে শিক্ষকরা উদ্বিগ্ন। তবে ইউজিসি সব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে সমাধানে আসতে পারে। অন্যথায় ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হবে।

জানা যায়, বর্তমানে দেশে অনুমোদিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৮টি। এর মধ্যে ৫৫টিতে বর্তমানে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। এতদিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনুমোদিত বাজেটের মধ্যেই গবেষণার জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকত। শিক্ষকরা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রস্তাব জমা দিতেন। বিভাগ, অনুষদ ও গবেষণা কমিটির মাধ্যমে যাচাই শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গবেষণা অনুদান অনুমোদন করত। নতুন ব্যবস্থায় সেই প্রক্রিয়া বদলে যাচ্ছে। গবেষণা প্রকল্পের অর্থ থাকবে ইউজিসির কাছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা পরিকল্পনা, উপখাতভিত্তিক অর্থের চাহিদা এবং বাজেট প্রাক্কলন পাঠাতে হবে। পরে ইউজিসি প্রকল্প বিবেচনা করে অর্থ ছাড় দেবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বলেন, গবেষণার বরাদ্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকাই উচিত। ইউজিসি কখনো এটার সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারবে না। এই উদ্যোগ পুনরায় বিবেচনা করা উচিত।

গবেষণা বরাদ্দ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আপত্তির প্রেক্ষাপটে ৯ জুলাই ইউজিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ঢাবি, জাবি, জবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের সমস্যা ও প্রস্তাব তুলে ধরবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা গবেষণায় কোনো ধরনের ছাড় দেব না। আমাদের বাজেট না দিলেও আমরা গবেষণায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক বলেন, গবেষণা মূল্যায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কাঠামো রয়েছে। বিভাগীয় গবেষণা কমিটি, অনুষদ ও বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রকল্প যাচাই করা হয়। ফলে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা ও মান সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।