স্পেনের ঐতিহাসিক ফোয়ারা ভেঙে কিশোরের মৃত্যু আর্জেন্টিনার ওবেলিস্কে রণক্ষেত্র ও দুই প্রবীণের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধফুটবল কখনো পরম আনন্দ দেয়, আবার কখনো তা রূপ নেয় এক নির্মম ও বুকভাঙা বিষাদে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে যখন দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার মুকুট মাথায় তুলল স্পেন, তখন মাদ্রিদ থেকে বুয়েনস আইরেস, সবখানেই তৈরি হলো ভিন্ন দুই আবেগের মহাসমুদ্র।একদিকে স্প্যানিশদের বাঁধভাঙা আনন্দের ঢেউ, অন্যদিকে আলবিসেলেস্তেদের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। কিন্তু কে জানত, মাঠের সেই ৯০ মিনিটের লড়াইয়ের পর দুই দেশের রাজপথেই অপেক্ষা করছে অন্য এক ট্র্যাজেডি, যা এক মুহূর্তের মধ্যে উৎসবের রঙকে ধুয়েমুছে করে দেবে মলিন ও রক্তাক্ত।একটি ফোয়ারা, একটি কিশোরের প্রাণ এবং স্পেনের কান্নার রোলফাইনালের রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই স্পেনের পর্তুগাল সীমান্তবর্তী সালামানকা প্রদেশের ঐতিহাসিক প্রাচীরঘেরা শহর সিউদাদ রদ্রিগো মাতোয়ারা হয়েছিল জয়ের উল্লাসে। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক আরবোল গর্দো ফোয়ারার চারপাশে জড়ো হয়েছিলেন শত শত ফুটবলপ্রেমী। কিন্তু রাত ১২টার কিছুক্ষণ পর সেই বাঁধভাঙা আনন্দ রূপ নেয় গগনবিদারী আর্তনাদে।প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আচমকাই স্মৃতিস্তম্ভটির ওপরের অংশটি ভেঙে নিচে থাকা মানুষের ওপর ধসে পড়ে। চোখের পলকে ঘটনাস্থলেই চাপা পড়ে প্রাণ হারায় ১৩ বছরের এক কিশোর। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আহত হন আরও দুজন, যাদের হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঐতিহাসিক এক বিশ্বজয় উদযাপনের রাত নিমেষেই পরিণত হলো এক মায়ের বুক খালি হওয়ার কালরাতে।এই আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে সিউদাদ রদ্রিগো নগর কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানায়, "পুরো শহর আজ এই অকাল মৃত্যুতে শোকাহত। আমরা নিহতের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই... স্প্যানিশ জাতীয় দলের বিশ্বকাপ জয়ের যে আনন্দ উৎসবে রূপ নেওয়ার কথা ছিল, তা আজ এক নির্মম ট্র্যাজেডিতে পরিণত হলো।"বুয়েনস আইরেসে দুই সমর্থকের মৃত্যু ও রণক্ষেত্র ওবেলিস্কওদিকে রানার্স-আপ হওয়া আর্জেন্টাইন জাতীয় দলকে শ্রদ্ধা জানাতে এবং লিওনেল মেসিদের লড়াকু ফুটবলকে অভিবাদন জানাতে বুয়েনস আইরেসের ওবেলিস্কে জমে উঠেছিল হাজারো মানুষের ভিড়। বিকেল থেকেই সেখানে ছিল সমর্থকদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও গান। কিন্তু মাঠের ভেতরের চরম মানসিক চাপ ও উত্তেজনা সহ্য করতে পারেননি দুই প্রবীণ সমর্থক। স্থানীয় জরুরি চিকিৎসা সেবা সংস্থা নিশ্চিত করেছে, ফাইনাল ম্যাচ চলাকালেই বুয়েনস আইরেসে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়ে ৬৭ ও ৮৮ বছর বয়সী দুই ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছেন।তবে ট্র্যাজেডির এখানেই শেষ ছিল না। গভীর রাত হতেই ওবেলিস্কের সেই জনসমাবেশ রূপ নেয় মারাত্মক ও অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় পুলিশ ঢাল, পেপার স্প্রে, টিয়ারশেল ও মোটরবাইক নিয়ে অভিযানে নামে। উচ্ছৃঙ্খল সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করতে ব্যবহার করা হয় রাবার বুলেট, লাঠিচার্জ এবং জলকামান। কিছুক্ষণ আগের উৎসবের রাজপথ মুহূর্তেই পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। গভীর রাতের এই অভিযানের পর ওবেলিস্কের চারপাশে পড়ে থাকে ভাঙা কাঁচের বোতলের স্তূপ, রাবার বুলেটের খোসা, খালি ক্যান আর আকাশি-সাদা রঙের সাজসজ্জার ছিন্নভিন্ন সরঞ্জাম।মারদে প্লাতা অ্যাভিনিউ ধরে প্রায় পাঁচ ব্লক এলাকা জুড়ে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হলেও সিটি সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি। একটি ফুটবল ফাইনাল, যা কোটি মানুষকে কাঁদিয়েছে মাঠের হারে, তা মাঠের বাইরেও রেখে গেল মৃত্যুর বিষাদ আর ভাঙচুরের ক্ষতচিহ্ন।